
ইলিশের উৎপাদন বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মাছটির দাম নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য গবেষকরা। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় নদীর জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নদীর পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, দূষণ, নাব্যতা সংকট ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উজানের দিকে ইলিশের বিচরণ কমেছে। ডিম থেকে ফুটে বের হওয়ার পর রেণু ইলিশ বড় হওয়ার জন্য চাঁদপুরের নদী এলাকায় আসে। এসব জলাশয় কার্যকরভাবে ব্যবহার করে কীভাবে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। ড. তায়েফা আহমেদ জানান, বর্তমানে চাঁদপুরে ছয়টি গবেষণা প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে ‘পপুলেশন ডায়নামিকস অ্যান্ড স্টক অ্যাসেসমেন্ট অব টেনুয়ালোসা ইলিশা ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশের মজুত, বিচরণ ও উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। তার আশা, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চাঁদপুরে আবারও ইলিশের প্রাচুর্য ফিরবে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় উৎপাদন হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সারাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনে নামলেও চাঁদপুরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টনে। তবে ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে ইলিশের ডিম উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজি। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে। গবেষণার হিসাবে, ডিম থেকে রেণু ও জাটকায় পরিণত হওয়ার পর বেঁচে থাকার হারও কমেছে। ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় হতাশ চাঁদপুরের জেলেরাও। রাজরাজেশ্বরের জেলে বাচ্চু বেপারি বলেন, গতবারের তুলনায় এবার নদীতে ইলিশ অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। তেলের দামসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় জেলেদের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাটেও কমেছে ইলিশের সরবরাহ। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ৫০০ গ্রামের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা এবং ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় ঘাটে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার দাবি, ২০২২ সালে এই সময়ে ঘাটে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মণ ইলিশ এলেও বর্তমানে আসে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ, কখনো তারও কম। তিনি ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সাগরে ট্রল জাল বন্ধ এবং নৌপথের ডুবোচর অপসারণ করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। এদিকে মা ইলিশ রক্ষায় ২০২৬ সালের প্রধান প্রজনন মৌসুমে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার পদ্মা-মেঘনা নদীতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হবে। চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণের মোট ৪২ হাজার ৭৯০ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম বলেন, ইলিশের দাম কমাতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টনে। তিনি বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় অভিযানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যাতে আর্থিক সংকটে না পড়েন, সে বিষয়েও সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর নৌ থানার ওসি মো. আজমগীর হোসাইন জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে কঠোর অভিযান চালানো হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


