
মো. কামাল উদ্দিনঃ
পুলিশের পোশাক রাষ্ট্রীয় আইন, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও জনগণের আস্থার প্রতীক। এই দায়িত্বে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও মানুষের প্রতি কর্তব্য। তাই পুলিশের পথ কখনো মসৃণ নয়—প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনা, সাফল্যের পাশাপাশি কঠিন পরিস্থিতির দায়ও থাকে।
একজন কর্মকর্তাকে বিচার করতে হলে একটি ঘটনা, বদলি বা বিতর্ক দিয়ে নয়; তার সামগ্রিক দায়িত্ববোধ, কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পরবর্তী দায়িত্বের ধারাবাহিকতা দিয়ে বিচার করাই যুক্তিসঙ্গত।
এই বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ নাম আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর।
চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় তিন মাসের মাথায় ২১ সেপ্টেম্বরের পুলিশ সদর দপ্তরের প্রজ্ঞাপনে জনস্বার্থে তাকে ঢাকা মহানগর পুলিশে বদলি করা হয়। পরদিনই নতুন দায়িত্বের দরজা খুলে যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর ডিএমপি কমিশনারের আদেশে তাকে গুলশান মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়।
তাহলে কোতোয়ালী থেকে ডিএমপিতে বদলি কি ‘অপমানের বদলি’?
প্রশাসনিক বাস্তবতা তা বলে না।
বদলি মানেই শাস্তি নয়
পুলিশ প্রশাসনে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এক কর্মস্থল থেকে অন্যত্র পাঠানো হলেই সেটিকে শাস্তি, অপমান বা ব্যর্থতার প্রতীক বলা যায় না। আবু জায়েদ নাজমুন নূরের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম থেকে ডিএমপিতে বদলির পর তাকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ গুলশান থানার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ কোতোয়ালীর অধ্যায় শেষ হলেও তার পেশাগত যাত্রা থামেনি; বরং নতুন ও আরও সংবেদনশীল দায়িত্বে তা এগিয়েছে।
বিতর্কের চেয়ে বড় দায়িত্ব
একজন ওসির কাজ মামলা নেওয়া বা থানার প্রশাসন পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়। জননিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত, সামাজিক উত্তেজনা মোকাবিলা এবং নাগরিকদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক—সবই তাকে সামলাতে হয়। অনেক সময় যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, কোনো না কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হয়। সেখানেই পেশাদারিত্বের পরীক্ষা।
জায়েদ নূরকে ঘিরে অতীতের আলোচনা ও সমালোচনার সবকিছুকে এক কথায় সত্য বা মিথ্যা বলা যায় না। অভিযোগ থাকলে প্রমাণ, তদন্ত ও প্রশাসনিক মূল্যায়নই চূড়ান্ত। তবে একটি বিতর্ক দিয়ে পুরো কর্মজীবনকে সংজ্ঞায়িত করাও ন্যায়সংগত নয়।
কোতোয়ালী থেকে গুলশান
চট্টগ্রামের কোতোয়ালী নগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থানা। পুরোনো বাণিজ্যিক এলাকা, আদালতকেন্দ্রিক কার্যক্রম, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিপুল জনসমাগমের কারণে এখানে দায়িত্ব পালন সহজ নয়। সময়টা প্রায় তিন মাস হলেও দায়িত্বের প্রকৃতি তাকে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা দিয়েছে।
সেখান থেকে সরাসরি ডিএমপিতে এসে গুলশান থানার দায়িত্ব পাওয়া তার পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
গুলশান কূটনৈতিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে শুধু কঠোরতা নয়, প্রয়োজন বিচক্ষণতা; শুধু আইন প্রয়োগ নয়, তার সঠিক পদ্ধতি; শুধু অপরাধ দমন নয়, নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করা জরুরি।
সুতরাং এই দায়িত্ব তার জন্য বড় পেশাগত পরীক্ষা।
মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে কাজ
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন ও পুলিশ প্রশাসন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি—একজন কর্মকর্তাকে পুরো কর্মজীবন দিয়ে বিচার করতে হয়। একটি ঘটনা দিয়ে কাউকে চূড়ান্তভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, একটি বদলি দিয়ে ব্যর্থ বলা যায় না, আবার একটি পদায়ন দিয়েও সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা যায় না।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে তার কাজ, আচরণ, সিদ্ধান্ত ও আইনের প্রতি আনুগত্যে।
গুলশানে আবু জায়েদ নাজমুন নূর যদি নাগরিকবান্ধব পুলিশিং, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সাড়া, সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন, সেটিই হবে তার পেশাগত সক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।
নতুন দায়িত্ব, নতুন সুযোগ
কোনো কর্মকর্তাকে ‘বিতর্কিত’ বলে চিহ্নিত করা সহজ; প্রকৃত মূল্যায়ন কঠিন। কারণ প্রতিদিন তাকে কঠিন ও কখনো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে জনপ্রিয়তার চেয়ে আইন, বিধি, দায়িত্ব ও জনস্বার্থই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
এই দৃষ্টিতে গুলশানের দায়িত্বকে আমি আবু জায়েদ নাজমুন নূরের নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করার সুযোগ হিসেবে দেখি। তিনি অতীতের আলোচনাকে নয়, অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারেন। প্রমাণ করতে পারেন—একজন পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় কোনো শিরোনামে নয়, তার কর্মে।
এবার গুলশান দেখুক তার পুলিশিং
কোতোয়ালী তাকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিবেশ, জনসমাগম, নগর অপরাধ, প্রশাসনিক চাপ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তবতা শিখিয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতার পরীক্ষা হবে গুলশানে।
গুলশানের মানুষ দেখবে তার পুলিশিং, সহকর্মীরা দেখবেন নেতৃত্ব, ঊর্ধ্বতনরা দেখবেন প্রশাসনিক দক্ষতা। সাধারণ মানুষ দেখবে থানার দরজা কতটা উন্মুক্ত, পুলিশ কত দ্রুত সাড়া দেয় এবং আইন কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হয়।
ঝড়ের পর নতুন অধ্যায়
পেশাগত জীবনে সমালোচনা, ভুল বোঝাবুঝি ও বিতর্ক আসতেই পারে। কিন্তু পেশাদারের শক্তি হলো—এসবের মধ্যেও দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হওয়া।
কোতোয়ালীর অধ্যায় শেষ হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, আর তার ধারাবাহিকতায় গুলশান থানার দায়িত্ব এসেছে তার কাঁধে।
কোতোয়ালী থেকে গুলশান—এটি কেবল কর্মস্থল পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি একজন পুলিশ কর্মকর্তার নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ।
সমালোচনা থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, নজরদারিও থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত মূল্যায়ন হবে দায়িত্ব পালনের মানে।
ঝড় পেরিয়ে তিনি গুলশানে।
এবার তার কথা বলবে তার কাজ।


