
মো.কামাল উদ্দিনঃ
আমি কেবল নাম শুনেছি—শারা সুলতানা।
তাকে কখনো দেখিনি, তার কণ্ঠস্বর শুনিনি, তবু অদ্ভুত এক আকর্ষণ কাজ করে তার প্রতি।
সে এক অচেনা, অজানা, অথচ হৃদয়ের একান্ত চেনা মানুষ।
তার একটি ছবি দেখেই মন যেন কোথায় হারিয়ে গেছে—
চোখের পাতায় জমে আছে এক অনন্ত অনুভব,
যেন কোনো গোধূলির বিকেলে আমার নিঃশব্দ স্বপ্নে এসে দাঁড়ায় সে।
তার মুখশ্রী, তার চাহনি—সব কিছুই যেন বাস্তব নয়,
তবু বাস্তবতার চেয়ে বেশি সত্যি লাগে।
আমি অনুভব করি, সে হয়তো জানেই না
কত গভীরে জায়গা করে নিয়েছে সে আমার মনের কোণে।
আমি ভাবি—কবে সে জানবে, তার ছবির ভেতরেই আমি খুঁজে নিই শরীর ছোঁয়ার অনুভব,
কবে সে বুঝবে, আমার নির্জন রাতগুলোতে
তার ভাবনার ভাঁজে জেগে ওঠে কামনার এক অদৃশ্য আগুন?
সে যদি জানত—
আমি তার চেহারায় শারীরিক স্বপ্ন দেখি না শুধু,
আমি সেখানে দেখি প্রেমের সূক্ষ্ম রূপ,
একটি নিঃশব্দ আকর্ষণ, যা কেবল মন দিয়ে অনুভব করা যায়।
সে যদি জানত—
এই অজানা সুরের ভেতরেই আমি খুঁজি জীবনের এক পরিপূর্ণ গান।
আপনার মুখাবয়বের মধ্যে একটি গভীর আর নিরব আলো জ্বলে, যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা মেঘ ভেদ করে ঠিকরে পড়ছে এক চিলতে সূর্যের আভা। আপনার চোখ দু’টি যেন দূর সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া নাবিকের শেষ আশ্রয়— যেখানে ক্লান্তি থেমে যায়, সেখানে আবেগ সাড়া জাগায়। আপনি যখন হাসেন, মনে হয় পৃথিবীর যাবতীয় কৃত্রিমতা হেলে পড়ে একপাশে, আর প্রকৃত রূপ শুধু আপনার মধ্যেই ধরা দেয়।
কিন্তু এই মুগ্ধতা কেবল আবেগে আটকে থাকে না— এটি শরীর ছুঁয়ে যায়, স্পন্দনের মতো। আপনার চেহারার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি মৃদু অভিব্যক্তি যেন শরীরের গহীনে গিয়ে এক অনির্বচনীয় স্পর্শ তৈরি করে। আমি বুঝি না, কেনো বা কীভাবে— তবে আপনার দিকে তাকালে আমার চেতনা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় কোনো অনিশ্চিত স্বপ্নের ভিতরে। সেই স্বপ্ন শরীরী, কিন্তু তা অশ্লীল নয়; কামনাময়, কিন্তু তা রুচিশূন্য নয়। বরং তা এমন এক সৌন্দর্যের ছায়াপথ, যেখানে চাওয়া আর না-চাওয়ার মাঝখানে দোল খায় এক নীরব আকাঙ্ক্ষা।
আপনার মুখের গঠন, সেই হালকা হাসি, করুণাময় চোখ— সবকিছু মিলে আপনি যেন হেঁটে আসছেন কবিতার ভেতর থেকে। আপনার ঠোঁটের কোণে যে ব্যাকুলতা, তা বুঝি না শব্দে বলা যায় কি না, কিন্তু তা অনুভবে এক আবেশ এনে দেয়। কখনো মনে হয়, আপনি কোনো এক শীতল সন্ধ্যায় শরীরের উপর পড়ে থাকা চাদরের মতো, কোমল আর উষ্ণ; কখনো বা উত্তাল বর্ষায় ভেজা জানালার কাঁচে জমে থাকা বিন্দুর মতো— স্পর্শযোগ্য নয়, কিন্তু আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য।
আমি যখন চোখ মেলি, তখন আপনার মুখ দেখা দেয়; যখন চোখ বন্ধ করি, তখনো আপনি রয়ে যান ভেতরে কোথাও। আপনি কি জানেন, কতটা শক্তি লাগে এমন করে কারো দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখা? আমি আপনাকে স্পর্শ করিনি, আপনাকে ছুঁয়ে দেখিনি, কিন্তু আপনার চেহারার ভেতর দিয়ে আমি অনুভব করেছি শরীরের শব্দহীন স্পন্দন। যেন শরীরের প্রতিটি কণিকা এক সুরে গুনগুন করে উঠেছে— “তুমি তাকে ভালোবাসো, এমনভাবে, যেমন শরীর নিজেই ভালোবাসে অস্তিত্বকে।”
এই ভালোবাসা কোনো ছোঁয়ার গল্প নয়, এটি এক অন্তর্লীন আকর্ষণের বিবরণ, যেখানে চেহারার সৌন্দর্য শরীরের স্বপ্ন হয়ে ওঠে। আপনি যখন চুপ থাকেন, আমি শুনি সেই নীরবতায় দোলা দেওয়া আবেগের আওয়াজ। আপনি যখন তাকান, মনে হয় আমার গায়ে এসে পড়েছে এক আলো, যা উষ্ণ, যা ধীরে ধীরে খুলে দেয় আমার অভ্যন্তরের এক গোপন দরজা। সেই দরজার ওপাশে লুকিয়ে থাকে শরীরী কামনার চেয়ে অনেক বেশি— লুকিয়ে থাকে আপনির ছায়ার আশ্রয়ে এক অলিখিত কবিতা।
আপনার চেহারা আমার কাছে কোনো ক্যানভাস নয়, যা আঁকা যায়; বরং তা যেন এক বর্ণহীন ইন্দ্রিয়, যা অনুভবে জাগে, কামনায় জ্বলে, প্রেমে জড়ায়। আপনি একজন মানুষ; তবু আপনার চেহারার মধ্যে রয়েছে দেবীসুলভ এক পবিত্রতা। সেই পবিত্রতা কখনো কামনার পথ রোধ করে না— বরং সেই কামনাকে করে শিল্পিত, রুচিশীল, এক আশ্চর্য গভীরতায় ভরা।
প্রেম যদি হয় চোখের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শরীরী স্বপ্নের পথ, তবে আপনি সে পথের দিশারী। আপনাকে দেখে আমার মধ্যে এক বিস্ময় জাগে— আমি চাই, আপনি থাকুন আমার দিনের আলোয়, রাতের স্বপ্নে, সকালবেলার কোমল কুয়াশায়। আপনি যেন বসন্তের মতো— আসেন, রঙ ছড়ান, তারপর থেকে যান হৃদয়ের মর্মে।
আমার এ লেখা আপনি পড়বেন কি না জানি না। যদি পড়েন, তাহলে বুঝবেন, এখানে কোনো চাহিদা নেই, কোনো দখল চাওয়া নেই। আছে শুধু প্রশংসা, আছে মুগ্ধতা, আর আছে সেই স্বপ্ন— যা আপনার চেহারার ছায়ায় প্রতিনিয়ত জন্ম নেয়। আমি জানি না, এই আকর্ষণ কোনোদিন বাস্তবতায় রূপ নেবে কি না। তবু আমি স্বপ্ন দেখি— আপনি থাকেন তাতে, আপনার চোখ, আপনার হাসি, আর সেই চেহারা— যা আমার প্রতিটি রাতে এক নতুন শরীরী কাব্য হয়ে ধরা দেয়।
আপনি জানেন? আমি কখনো কখনো ভয় পাই। এই অনুভূতির ওজন এতটাই ভারি যে মাঝে মাঝে মনে হয়, আপনি বুঝি এই পৃথিবীর কেউ নন— আপনি কোনো অন্য গ্রহের আলো, যা ভুল করে এখানে এসে আমার হৃদয়টা আলো করে দিয়েছে। এই আলো নিঃশব্দ, কিন্তু প্রবল। এটি আমার ভিতরকে আলোড়িত করে, ঘূর্ণিতে ফেলে দেয়। আপনি যখন একটু হেসে তাকান, তখন আমি যেন ভেতরে ভেঙে পড়ি— এক নির্মল ধ্বংসের মধ্যে, যেখানে শুধু আপনিই রয়েছেন।
আমি কখনো বলিনি— আপনার দিকে তাকালে আমার গায়ে কাঁটা দেয়। আমি কখনো বলেনি— আপনার ছবির সামনে বসে আমি হারিয়ে যাই শরীরের গভীরতায়। এই প্রথম বলছি— আমি কেনো যেন আপনার চেহারায় শারীরিক স্বপ্ন দেখি। তা কোনো অশ্লীল আকর্ষণ নয়; এটি এক পবিত্র কামনা— যেখানে শরীর আর হৃদয় মিলেমিশে আপনাকে ভালোবেসে ফেলে, আপনাকে চায়, আপনাকে ধরে রাখতে চায় হৃদয়ের প্রাচীরে।
আপনি জানলে অবাক হবেন— আপনার ছবি আমি প্রতিদিন দেখি না। আমি সেটিকে একটি বিশেষ মুহূর্তের জন্য তুলে রেখেছি। যেন এক পূজার প্রসাদ— প্রতিদিন নয়, বিশেষ কোনো দিন, হৃদয়ের রোদেলা দুপুরে, একা সময়ের মাঝে, যখন হৃদয় বলে, “এখন তাকে দেখো।” তখন দেখি। তাকাই। আর তখনই শরীরের এক অচেনা স্বপ্ন যেন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে।
আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আর আপনি সেই স্বপ্নের কেন্দ্র। আমি হয়তো আপনাকে ছুঁতে পারবো না, হয়তো আপনাকে কখনো পাবো না। তবু যতদিন এই অনুভূতি বাঁচে, ততদিন আমার ভিতরে আপনি রয়ে যাবেন। আপনি হয়ে উঠবেন আমার প্রতিটি শরীরী স্বপ্নের রূপ— গভীর, মৃদু, রুচিশীল, শিল্পিত এবং প্রেমময়।
লেখকঃসাংবাদিক, সাহিত্যিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।

