
—মো. কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রাম আজ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি নয়; এটি দাঁড়িয়ে আছে তার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতির অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা এবং নাগরিক সেবায় অনিয়ম—এসবের ভার বহন করতে করতে নগরবাসী ক্লান্ত। এমন এক প্রেক্ষাপটে ডাক্তার শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্ব ছিল আশার আলো, একটি নৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি। সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী–এর আমলে নানা অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ নগরজুড়ে আলোচিত হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ, অবকাঠামো নির্মাণে স্বচ্ছতার ঘাটতি, প্রশাসনিক প্রভাববলয়ের বিস্তার—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নগরবাসী জানতে চায়। অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ হোক আইন ও তদন্তের মাধ্যমে; কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—চট্টগ্রাম একটি নতুন আস্থার পরিবেশ চেয়েছিল। সেই আস্থার নাম হয়ে উঠেছিলেন ডাক্তার শাহাদাত হোসেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা ছিল পরিষ্কার—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, নাগরিকদের অভিযোগ শোনা, সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট বক্তব্য—এসব পদক্ষেপ একটি গণমুখী প্রশাসনের ইঙ্গিত বহন করে।

চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো সাময়িক নয়; এগুলো দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট। জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার, নগর সড়ক সংস্কারে গুণগত মান নিশ্চিতকরণ—এসব কাজ ধারাবাহিক নেতৃত্ব ছাড়া সম্ভব নয়। মাঝপথে প্রশাসনিক পরিবর্তন উন্নয়নকে ব্যাহত করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন চক্রকে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেয়। চট্টগ্রাম কেবল একটি শহর নয়—এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, বন্দরনগরী, সংস্কৃতির ধারক। এই নগরকে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরীক্ষাগার বানানো হলে তার ক্ষতি বহুগুণে বাড়বে। বরং প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল, গ্রহণযোগ্য এবং কর্মমুখী নেতৃত্ব, যিনি অন্তত নতুন প্রশাসক বা মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন। আমরা দেখেছি, অতীতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে যারা দায়িত্বে এসেছেন, প্রত্যেকেই শুরুতে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কিন্তু সিস্টেমের ভেতরের দুর্বলতা, স্বার্থান্বেষী চক্র এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক সময় সেই প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় একজন সদিচ্ছাপূর্ণ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতাকে সময় দেওয়া জরুরি।
ডাক্তার শাহাদাত হোসেনের প্রতি যে জনআস্থা গড়ে উঠেছে, তা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; এটি এসেছে প্রত্যাশা ও বিশ্বাসের সমন্বয়ে। নগরবাসী মনে করে—তিনি অন্তত একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করেছেন। সেই ভিত্তি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে সময় প্রয়োজন। দায়িত্বের এই সন্ধিক্ষণে তাকে সরিয়ে দিলে চলমান উদ্যোগগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।

আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। যেকোনো অভিযোগের তদন্ত হোক নিরপেক্ষভাবে। কিন্তু একই সঙ্গে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। চট্টগ্রামের বৃহত্তর স্বার্থে, নাগরিক সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমকে পূর্ণতা দিতে ডাক্তার শাহাদাত হোসেনকে অন্তত নতুন প্রশাসক বা মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত দায়িত্বে বহাল রাখা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে পারে। নগর আজ স্থিতিশীলতা চায়, প্রতিশোধ নয়। নগর আজ উন্নয়ন চায়, অস্থিরতা নয়। নগর আজ আস্থার ধারাবাহিকতা চায়—যেখানে দায়িত্ব হবে জনকল্যাণের, আর নেতৃত্ব হবে নৈতিকতার। চট্টগ্রামের স্বার্থেই প্রয়োজন—আলোর এই যাত্রা যেন মাঝপথে থেমে না যায়।


