শিরোনাম
ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ, বাতিল ১০৩ অনাপত্তি সনদরাষ্ট্রীয় পুলিশ পদকের স্বীকৃতি পাচ্ছেন বাবুল আজাদ কঠিন সময়ে পাহাড়তলী থেকে ডবলমুরিং, চকবাজার হয়ে ডিবিতে; সাহস, মেধা ও পেশাদারিত্বে উজ্জ্বল এক পুলিশ কর্মকর্তার পথচলা-জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রীসতীশ বাবু লেইনের ভাইরাল ছিনতাই: মূলহোতা সাদ্দাম গ্রেফতারআন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মানবিক পুলিশিংয়ের নতুন দিগন্ত আইসিআরসি ও এপিবিএনের যৌথ প্রশিক্ষণ: আইন প্রয়োগে মানবাধিকার, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতায় হাসিব আজিজের নেতৃত্বে নতুন ভাবনাআমার ছেলেবেলা ৬ সেই রাতগুলো আজও মনে পড়েএপিবিএন: ইতিহাসের অগ্রযাত্রায় জিয়াউর রহমান থেকে আজিজুল হক, আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজ একটি বাহিনীর জন্ম, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভাবনার বিবর্তন, দুই প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং জননিরাপত্তার নতুন অঙ্গীকারবৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহানগর কমিটির প্রথম সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত কালুরঘাট সেতু নির্মাণ, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনসহ ১০ দফা নাগরিক ইস্যুতে কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্তচট্টগ্রাম মেডিকেলে ইউনিট-২ চালুসহ ডেঙ্গু চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি পরিচালকের সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মতবিনিময় রোগী হয়রানি ও দালালচক্র বন্ধ, জনবল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সচলের ওপর জোরযেসব কারণে বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

― Advertisement ―

“একক নেতৃত্বের ছায়া: আহসান এইচ মনসুর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিতর্কিত অধ্যায়”

Homeজাতীয়“একক নেতৃত্বের ছায়া: আহসান এইচ মনসুর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিতর্কিত অধ্যায়”

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একক শাসনের অধ্যায়: আহসান এইচ মনসুরের বিতর্কিত নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রতীক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়টি এক অস্থির অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ড. আহসান এইচ মনসুর–এর দায়িত্ব গ্রহণ থেকে অপসারণ পর্যন্ত পুরো সময়কালজুড়ে যে বিতর্ক, ক্ষোভ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে—তা কেবল প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি নেতৃত্বের ধরন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ১. ‘স্বার্থের সংঘাত’ অভিযোগ: নৈতিকতার প্রশ্নে প্রথম আঘাত গভর্নরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ ছিল—ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা থাকা অবস্থায় অনুদান প্রদান। বিষয়টিকে ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নৈতিক মানদণ্ড সর্বোচ্চ হওয়া উচিত। অভিযোগ ওঠে, কিছু সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে করে প্রশ্ন ওঠে—ব্যাংকের নীতিগত নিরপেক্ষতা কি ক্ষুণ্ন হয়েছে? এই প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি ওঠে। কিন্তু।অভিযোগকারীদের মতে, সেই দাবির প্রতি গভর্নরের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ২. সংস্কারের নামে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা? ড. মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেন। পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ছিল তার কৌশলের অংশ। কিন্তু কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ—এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণমূলক আলোচনার অভাব ছিল। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তিন কর্মকর্তাকে ‘স্বৈরাচার’ মন্তব্যের অভিযোগে শোকজ করা হয়। পরে তাদের বদলিও ঘটে। এতে কর্মপরিবেশে ভীতি ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। কর্মকর্তারা বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে এবং ন্যায্য দাবিগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। ৩. অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও প্রতিবাদ ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা প্রকাশ্যে গভর্নরের নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। তারা দাবি করেন, ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বদলে একক সিদ্ধান্তনির্ভর শাসন কায়েম হয়েছে। দীর্ঘ সাত-আট মাস ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দাবি উত্থাপন করলেও সেগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা হয়নি। ‘কলমবিরতি’র ঘোষণাও দেওয়া হয়—যা একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছিল। ৪. গভর্নরের প্রতিক্রিয়া: পাল্টা অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে ড. মনসুর অভিযোগ করেন—কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় কাজ করছেন এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। তিনি বলেন, সার্ভিস রুলস মেনে চলা বাধ্যতামূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য পরিস্থিতি প্রশমিত করার বদলে বিভাজন আরও বাড়িয়ে দেয়। সংলাপের বদলে অবস্থানগত কঠোরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ৫. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও হঠাৎ অপসারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ১৪ আগস্ট ড. মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায়, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার নয় দিনের মাথায় গভর্নর পদে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নিয়োগ পান মোস্তাকুর রহমান—যিনি পেশায় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। ড. মনসুর সংবাদ সম্মেলনের পর জানতে পারেন তার স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ত্যাগ করেন। দিনভর উত্তেজনার মধ্যে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ৬. বিদায়ের ভাষা: সম্মান না প্রশ্নবোধক চিহ্ন? ড. আহসান এইচ মনসুর নিজেকে দলনিরপেক্ষ ও সংস্কারপন্থি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তার বিদায় সুখকর হয়নি। একদিকে তার কঠোর পদক্ষেপের ফলে কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দৃশ্যমান হয়েছিল—অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও অভিযোগের পাহাড় তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে শুধু নীতিগত দৃঢ়তা নয়, বরং আস্থা, সংলাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হোক বা না হোক—একটি বিষয় স্পষ্ট: নেতৃত্বের ধরন যদি প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য ভেঙে দেয়, তবে সংস্কারও বিতর্কে ডুবে যায়। উপসংহার আহসান এইচ মনসুর অধ্যায় আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে— সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া যায় না; তা গড়ে তুলতে হয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। অন্যথায়, ব্যক্তি বদলালেও সংকটের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। প্রেক্ষাপট: গভর্নর ও নীতিগত কঠোরতা বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নরের মূল দায়িত্ব হলো মুদ্রানীতি, ব্যাংক তদারকি, আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং মালিকানা জটিলতা নিয়ে সমালোচনা ছিল প্রবল। এই প্রেক্ষাপটে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি ও কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। এস আলম গ্রুপ–এর আর্থিক কাঠামো ও ঝুঁকি এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী—বিদ্যুৎ, চিনি, ভোজ্যতেল, ইস্পাত, শিপিং, ব্যাংকিং—বহু খাতে তাদের উপস্থিতি। অভিযোগ রয়েছে যে গ্রুপটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে বড় অংকের ঋণনির্ভর সম্প্রসারণ করেছে। যখন একটি গ্রুপের ঋণনির্ভরতা অত্যধিক হয়, তখন তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়— ১. তারল্য সংকটের ঝুঁকি ব্যাংক নতুন ঋণ সীমিত করলে বা পুরোনো ঋণের শর্ত কঠোর করলে নগদ প্রবাহ ব্যাহত হয়। এতে কাঁচামাল আমদানি, বেতন পরিশোধ, সুদ পরিশোধ—সবকিছু চাপের মুখে পড়ে। ২. ঋণ পুনঃতফসিল বন্ধ বা সীমিত হওয়া আগে যদি সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাওয়া যায়, কিন্তু পরে কঠোরতা আসে—তাহলে কিস্তি পরিশোধে চাপ বাড়ে। ৩. ব্যাংক মালিকানা ও প্রভাব সংকট যদি কোনো শিল্পগোষ্ঠী একাধিক ব্যাংকের সঙ্গে জটিল মালিকানা সম্পর্ক রাখে, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেখানে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে—তাহলে গ্রুপের আর্থিক কৌশল ব্যাহত হয়। গভর্নরের নীতির ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি ১. এলসি জটিলতা ও আমদানি সংকট ডলার সংকটকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলসি অনুমোদনে সতর্ক হলে আমদানিনির্ভর শিল্পে প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত শিল্পগুলো এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২. বাজারে আস্থাহীনতা যখন বড় কোনো গ্রুপকে ঘিরে তদন্ত, সীমাবদ্ধতা বা গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসে—তখন সরবরাহকারী ও ব্যাংক সতর্ক হয়ে যায়। এতে ব্যবসায়িক চক্রে গতি কমে যায়। ৩. কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লক্ষাধিক শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। উৎপাদন কমে গেলে বা প্রকল্প স্থগিত হলে কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে। তাহলে কি “ধ্বংসের উদ্দেশ্য” ছিল? এখানে আবেগের জায়গা আছে, কিন্তু প্রমাণের প্রশ্নটি বড়। কোনো গভর্নরের সাংবিধানিক দায়িত্ব শিল্প ধ্বংস করা নয়; বরং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা হলো— যদি দীর্ঘদিনের শিথিল নীতির পর হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, তাহলে বড় ঋণনির্ভর শিল্পগ্রুপ ধাক্কা খেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রশ্নটি “ব্যক্তিগত বিদ্বেষ” নয়; বরং— নীতির গতি, সময়, ও প্রয়োগপদ্ধতি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল? বৃহত্তর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর সংকট মানে— ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি আমদানি-রপ্তানি চক্রে বিঘ্ন স্থানীয় অর্থনীতিতে মন্দা শ্রমিক অসন্তোষ অন্যদিকে, যদি অনিয়ম বা অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রণ না করলে পুরো ব্যাংকিং খাতও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ— একদিকে শিল্প রক্ষা, অন্যদিকে আর্থিক শৃঙ্খলা— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই আসল চ্যালেঞ্জ। উপসংহার প্রশ্নটি কেবল “গভর্নর বনাম এস আলম” নয়। প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশের আর্থিক শাসনব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ, কতটা ন্যায়ভিত্তিক, এবং শিল্পনীতি কতটা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন?