
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বিএনপির সাংবাদিক হইয়েন না—নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করুন।”
এই কথাটি বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট রাজনীতিক আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ১ জুলাই গণআন্দোলনের স্মরণে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব আয়োজিত এক আলোচনায়। প্রথমে শুনে মনে হতে পারে, তিনি দলের বাইরে কাউকে সতর্ক করছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তিনি সতর্ক করেছেন দলের ঘনিষ্ঠ, তথাকথিত ‘অনুগত’ সাংবাদিকদের—যারা নিরপেক্ষতার চাদরে দলকানা সংবাদ পরিবেশন করে দলকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। আমির খসরু যথার্থই বলেছেন—চাটুকার সাংবাদিকতা কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের মঙ্গল বয়ে আনেনি। অতীতে আমরা দেখেছি, শেখ হাসিনার চারপাশে একদল তেলবাজ সাংবাদিক সবসময় এমন একটি চিত্র উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তার ভুলও ছিল প্রশংসিত। ফলে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াই ছিল অনিবার্য। সেই ভ্রান্তিপূর্ণ প্রশংসা একদিন তার জন্য রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও গণবিচ্ছিন্নতা ডেকে এনেছে।
বিএনপিকেও এখন সেই একই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে কিছু সুযোগসন্ধানী মুখোশধারী, যারা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে কিংবা বিশ্লেষকের মুখোশে, দলের আসল চিত্র আড়াল করে রাখছে। এমন পরিস্থিতিতে আমির খসরুর মন্তব্য শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সময়োপযোগী ও সাহসিকতার পরিচায়ক। তাঁর সেই বক্তব্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে আজকের এই বিশ্লেষণধর্মী লেখা— “অপারেশন ক্লিন হার্ট থেকে আজকের বিএনপি: আত্মসমালোচনার আয়নায় দলের ভবিষ্যৎ ভাবনা”—প্রকাশ করছি একজন দায়বদ্ধ, বিবেকবান, এবং সত্যপ্রিয় সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ থেকে।
কারণ, সত্য কথা বলা যদি দলের ক্ষতি হয়—তবে সেই দল হয়তো আগেই নিজের ক্ষতির বীজ বপন করেছে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই করে চলেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। যারা গুম, খুন, মামলা, হামলার ভয় উপেক্ষা করে আন্দোলনের পতাকা উঁচিয়ে রেখেছেন, তারা এখন আশার আলো দেখছেন—জনগণের অকুন্ঠ সমর্থন ও রাজপথের অর্জন হয়তো এবার সত্যি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ এনে দেবে। কিন্তু ঠিক এই মোক্ষম সময়ে, বিএনপির অভ্যন্তরে কিছু অসাধু, সুবিধাবাদী, সুযোগ সন্ধানী চক্র নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে ও অপকর্ম ঢাকতে দলের নাম ব্যবহার করে ‘অপ-রাজনীতির’ এক ভয়ঙ্কর ইতিহাস রচনা করছে। তারা দলের সুনাম, জনআস্থা ও দীর্ঘ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য—এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হচ্ছেন, যারা দলের ভেতর শুদ্ধতা ও জবাবদিহিতা চান, তাদেরকেই এখন ‘অতিউৎসাহী’, ‘শত্রু’র এজেন্ট বা ‘বিভ্রান্ত কর্মী’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এটা শুধু দলীয় গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক নয়, বরং গোটা বিএনপির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত। এখন সময় এসেছে—সঠিক, ত্যাগী, আদর্শবান নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর। সময় এসেছে—বিএনপির ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করে তাদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার। এই কাজ এখন না করলে, ভবিষ্যতের সুযোগ হতাশায় রূপ নিতে বাধ্য। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করবো—কেন বিএনপিকে এখনই নিজস্ব ভেতরের শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে, কীভাবে প্রকৃত রাজপথের সৈনিকদের মূল্যায়ন করা যায়, এবং কাদের জন্য দলের ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ২০০১ সালের পর বিএনপি যখন দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের রাজনৈতিক, আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক বাস্তবতা এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অপরাধ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, সর্বহারা, এবং ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উৎপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে দলীয় স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে বিএনপি সরকার কিছু যুগান্তকারী কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ ও র্যাব গঠন। এসব সিদ্ধান্ত আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন বিএনপির নিজের ভেতরেই নানা অস্থিরতা ও অসংগতি চোখে পড়ে। অপারেশন ক্লিন হার্ট: সেদিনের প্রেক্ষাপট-তৎকালীন বিএনপি সরকার সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসবাদ এবং অপরাধ দমনে এক কঠিন অবস্থান নেয়। সরকারি দল হিসেবে বিএনপি তার নিজের দলীয় ও অঙ্গসংগঠনের কিছু ‘অবাধ্য, নিয়ন্ত্রণহীন’ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজকে দমনে পেছপা হয়নি। নারায়ণগঞ্জের ‘ডেভিড’, পুরান ঢাকার ‘সগীর’-এর মত নামকরা অপরাধীদের একাংশ ছিল বিএনপির ছায়াতলে, কিন্তু তাদের ছায়াতল ভেঙে অপারেশন চালানো হয়েছিল। এই কঠিন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান। তাঁদের নেতৃত্বেই বিএনপি প্রমাণ করেছিল—দলের স্বার্থের চেয়ে দেশ, মানুষের নিরাপত্তা বড়। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির প্রবীণ নেতা তৈমুর আলম খন্দকারের মুখেই আমরা শুনেছি, কীভাবে অনেককে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল, অথচ তারা শোনেনি। এই সিদ্ধান্ত বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ব্যবসায়ী সমাজ তখন বলেছিল, “২০০০ সালে ১০ হাজার টাকা নিয়ে বের হতে ভয় পেতাম, ২০০৮ সালে কয়েক লাখ টাকা নিয়েও ভয় ছিল না।” এরচেয়ে বড় জনগণের স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? র্যাব গঠন: সর্বহারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিএনপি আমলে আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এটা এক টার্নিং পয়েন্ট। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ‘সর্বহারা পার্টি’র দাপট তখন ভয়াবহ ছিল। তারা দিনে-দুপুরে খুন করত, প্রকাশ্যে অস্ত্র চালাত, আর কেউ তাদের থামাতে পারত না। পুলিশ বাহিনী ছিল সীমিত সক্ষমতার। সেই প্রেক্ষাপটে র্যাব নামে একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে বিএনপি সরকার এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিল। র্যাবই প্রথম সর্বহারাদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালিয়ে কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী ও আত্রাই অঞ্চলের সন্ত্রাসের ভয়াবহতা কমিয়ে আনে। অনেক সর্বহারা নেতা ক্রসফায়ারে নিহত হয়। এই সময়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নয়ন ঘটে। জঙ্গি দমন: শায়খ আব্দুর রহমান ও হুযবুত তাহরীর দমন-বিএনপি আমলে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে শায়খ আব্দুর রহমান এবং তার নেতৃত্বাধীন জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB)। এদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিল অনেক আওয়ামীপন্থী লোকজনের, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হচ্ছেন আওয়ামীলীগ নেতা মীর্জা আজমের দুলাভাই শায়খ আব্দুর রহমান।
এই শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে দমন করা সহজ ছিল না। কিন্তু বিএনপি সরকার সময়ক্ষেপ না করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করে। শায়খ আব্দুর রহমান, বাংলা ভাই, সিদ্দিকুর রহমানসহ অনেক জঙ্গিকে ধরা হয়, আদালতে বিচার হয় এবং প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এর মাধ্যমেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জিরো টলারেন্স নীতি প্রতিষ্ঠা হয়।
দলীয় আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা
আজ যখন বিএনপি আবার রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে চায়, তখন এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে দলটির ভেতরেই কিছু ‘অযোগ্য, অনুচিত, অশোভন, চিহ্নিত খারাপ লোক’ ঢুকে পড়েছে। দলীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে পদপ্রত্যাশীদের ভিড় থাকলেও দলীয় নীতিনিষ্ঠ, দেশপ্রেমিক এবং সুশৃঙ্খল নেতৃত্বের অভাব চোখে পড়ে। একই সঙ্গে দেখা যায়, বহিষ্কারের নামে নাটক চলছে—এক নেতা বহিষ্কার করছে, আরেক নেতার ছায়ায় সেই একই ব্যক্তি আবার সক্রিয়। তাহলে দলের বার্তা কি বিভ্রান্তিকর হয়ে যাচ্ছে না? এভাবে একটা দল চলতে পারে না। বিএনপি যে শুদ্ধি অভিযান অতীতে অন্যের বিরুদ্ধে চালিয়েছে, সেই শুদ্ধির প্রয়োগ আজ নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। আজকের বিএনপি যদি নিজেকে শুদ্ধ না করে, ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না।
আওয়ামীলীগের ‘ভারত’, বিএনপির কোনো আশ্রয় নাই-আওয়ামীলীগের একটি সুবিধা আছে—তাদের ‘ভারত’ আছে। প্রয়োজনে তাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মী প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় পায়, তাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। বিএনপির এমন কোনো ব্যাকআপ নেই।
বিএনপি যদি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এসে প্রতিহিংসার শিকার হয়, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকবে না। এই বাস্তবতা বিএনপিকে বুঝে এখনই এমন রাজনৈতিক কৌশল নিতে হবে, যা সাধারণ জনগণের সহানুভূতি পাবে।
বিএনপিকে বুঝতে হবে—জনগণ এখন ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বনাম ‘বাকশাল’ বিতর্কে আটকে নেই। জনগণ এখন গণতন্ত্র, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা চায়। তাই বিএনপিরও উচিত হবে একবিংশ শতাব্দীর নতুন বাস্তবতায় সংগঠন সাজানো, নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মকে জায়গা দেওয়া এবং রাজনীতিকে মূল্যবোধনির্ভর করা। চূড়ান্ত কথা-বিএনপি অতীতে যেভাবে দলীয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে, সর্বহারাদের নির্মূল করেছে, জঙ্গি দমন করেছে—তা ছিল একটি সাহসী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এখন সময় এসেছে নিজেদের ভেতরের সমস্যা, দ্বন্দ্ব, ভণ্ডামি ও অসততা মোকাবিলার।
যারা আজ বিএনপির নামে অপকর্ম করে, চাঁদাবাজি করে, ভিডিও ভাইরাল করে—তাদের দ্রুত ও কার্যকরভাবে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে, তা যতই ‘আপন লোক’ হোক না কেন। আজকের বিএনপি যদি অতীতের বিএনপির মতো সাহসী না হয়, তবে ভবিষ্যতের জন্য ‘আরেকটা ৫ আগস্ট’ অপেক্ষা করবে। আর সেই বিপর্যয়ে হয়তো বিএনপিকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসবে না। তাই এখনই সময়—দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেবার। জনগণ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে—আপনারা কী করবেন?
চলবে–

