
ভ্রমণের সৌন্দর্য শুধু গন্তব্যে নয়, অনেক সময় পথের মাঝখানে থেমে থাকা কিছু মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে তার প্রকৃত আনন্দ। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশে যাত্রা করতে করতে আজ সন্ধ্যায় এমনই এক স্মরণীয় বিরতির সাক্ষী হলাম আমরা।
কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার মাত্র দুই দিন পর আবারও ক্লাবের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের উদ্দেশ্যে কক্সবাজারের পথে রওনা হয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন ক্লাবের সভাপতি আবু সৈয়দ ভাই, আশিকসহ কয়েকজন প্রিয় সহযাত্রী। পথ দীর্ঘ হলেও আড্ডা, আলোচনা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কারণে সময় যেন দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছিল।
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে বর্ষার মেঘের গাঢ় নীলাভ চাদর। কোথাও কোথাও বৃষ্টির ফোঁটা জানালায় এসে টুপটাপ শব্দ তুলে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে দূরের অরণ্যে। চকরিয়া সীমান্ত অতিক্রম করার সময় লোহাগাড়ার কাছাকাছি অবস্থিত ‘লামিসা’ রেস্তোরাঁয় কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি নিলাম। দূর থেকেই চোখে পড়ল রেস্তোরাঁটির বর্ণিল আলোকসজ্জা। সন্ধ্যার আধো-অন্ধকারে অসংখ্য আলো যেন চারদিকে এক মায়াবী আবহ তৈরি করেছে। কাঁচঘেরা আধুনিক স্থাপনাটি বাইরে থেকে যেমন আকর্ষণীয়, ভেতরে প্রবেশ করেও তেমনি মনে হলো যেন প্রকৃতি ও আধুনিকতার এক সুন্দর সমন্বয়। নরম আলোয় আলোকিত প্রশস্ত হলরুম, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুসজ্জিত টেবিল আর অতিথিদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়। আমরা একটি টেবিল ঘিরে বসে পড়লাম। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে আলো, আর চারদিকে ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কোলাহল—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি। জানালার ওপারে দেখা যাচ্ছিল মেঘে ঢাকা পাহাড়ের অস্পষ্ট অবয়ব। বর্ষার পানিতে ধোয়া সবুজ বনভূমি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক জীবন্ত জলরঙের ছবি। সাধারণত ভ্রমণের পথে মানুষ নানা ধরনের খাবার খেতে পছন্দ করে। কিন্তু সেদিন আমাদের পছন্দ ছিল একেবারেই সাধারণ—গরম চা আর পরোটা। তবুও সেই সাধারণ খাবারের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল অসাধারণ স্বাদ। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ মনে হলো, পরোটার টুকরো চায়ে ভিজিয়ে খেলে হয়তো স্বাদটা আরও বেড়ে যাবে। সেই সহজ সিদ্ধান্তই মুহূর্তটিকে আরও আনন্দময় করে তুলল। আমরা অন্য কোনো খাবারের দিকে না তাকিয়ে চা আর পরোটার সেই সরল অথচ হৃদয়ছোঁয়া স্বাদ উপভোগ করলাম।
আড্ডার বিষয়ও ছিল বৈচিত্র্যময়। কখনও ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কখনও কক্সবাজারের সম্ভাবনা, কখনও ব্যক্তিগত স্মৃতি, আবার কখনও নিছক হাস্যরস। মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা খুব সাধারণ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবান হয়ে ওঠে। আজকের এই সন্ধ্যাটা ছিল ঠিক তেমনই। একজন লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে আমি বহু দেশ, বহু শহর এবং অসংখ্য মানুষের গল্পের সাক্ষী হয়েছি। কিন্তু আজও মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখা থাকে এমনই সাধারণ মুহূর্তের ভাঁজে। একটি বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, কয়েকজন প্রিয় মানুষের সঙ্গ, এক কাপ গরম চা, আর পথের ধারে ছোট্ট একটি বিরতি—এসবই কখনও কখনও একটি দীর্ঘ ভ্রমণের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে থাকে। কক্সবাজারের পথে যারা যাত্রা করবেন, তারা যদি কিছুক্ষণ থেমে প্রকৃতির সান্নিধ্যে, আলো-ছায়ার মায়াবী পরিবেশে একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিতে চান, তাহলে লামিসা রেস্তোরাঁ হতে পারে একটি সুন্দর ঠিকানা। কারণ ভ্রমণের আসল আনন্দ শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ে নয়, অনেক সময় পথের ধারে বসে ভাগাভাগি করা এক কাপ চায়ের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। আজকের এই মেঘলা সন্ধ্যা, বৃষ্টিস্নাত পাহাড়, বর্ণিল আলোকসজ্জা, প্রাণখোলা আড্ডা আর চায়ের উষ্ণতা আমার স্মৃতির খাতায় একটি নতুন অধ্যায় হয়ে রইল। কক্সবাজার এখনও সামনে, সমুদ্র এখনও অপেক্ষায়; কিন্তু পথের এই ক্ষণিকের বিরতিটুকুও যেন এক অনন্য ভ্রমণগাথা হয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নিল।


