
-মো.কমাল উদ্দিনঃ আধুনিক বিশ্বে সাংবাদিকতা এখন আর শুধু পেশাগত সীমার মধ্যে আবদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নয়—এটি এক বিশাল তথ্য-প্রবাহ, প্রযুক্তিনির্ভর গণচেতনার আন্দোলন। একসময় যেখানে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হতো, আজ সেখানে একটি স্মার্টফোনই হয়ে উঠেছে তথ্য প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। এই পরিবর্তনের ভেতরেই সাংবাদিকতার সংজ্ঞা যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে এর শুদ্ধতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। আমাদের বাংলাদেশের তথাকথিত সাংবাদিকতার বর্তমান বাস্তবতা এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের স্রোতে এক জটিল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় যেমন সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অপসাংবাদিকতা, গুজব, যাচাইবিহীন তথ্য ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারের প্রবণতা। ফলে সাংবাদিকতার মূল দর্শন—সত্য, ন্যায্যতা ও জনস্বার্থ—অনেক ক্ষেত্রেই চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এক আলোচনায় উঠে এসেছে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য—আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সাংবাদিকের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় পাঁচ কোটি। অর্থাৎ, যার হাতে একটি মোবাইল থাকবে, তিনিও এক অর্থে সাংবাদিক হয়ে উঠবেন। এই বাস্তবতা হয়তো নতুন যুগের গণমাধ্যম বিপ্লবকে নির্দেশ করে, আবার একই সঙ্গে তা সাংবাদিকতার মান ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বড় প্রশ্নও তোলে। দেশবরেণ্য সাংবাদিক মতিউর রহমান-এর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও এই পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা ও উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ আধুনিক সাংবাদিকতার এই রূপান্তরকে আরও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এই প্রবন্ধে আমি সেই পরিবর্তন, সংকট এবং সম্ভাবনার আলো-ছায়ায় আধুনিক সাংবাদিকতা ও আমাদের দেশের বাস্তব চিত্রকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব—যেখানে প্রযুক্তি যেমন সুযোগ, তেমনি দায়িত্বও বহন করে। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব সাংবাদিকতার চেহারা আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। একসময় সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন ছিল তথ্য প্রচারের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু আজ মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইউটিউব এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষই যেন একেকজন “সংবাদ পরিবেশক” হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতার মাঝেই প্রবীণ সাংবাদিক ও প্রথিতযশা কলামিস্ট মতিউর রহমান চৌধুরী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কেবল একটি মন্তব্য নয়—বরং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সতর্কবার্তা। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন— “এখন আর সাংবাদিকতা নেই। কারণ এখন সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে না। সামাজিক মিডিয়ার যুগে সবাই সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল হাতে নিয়েই সবাই সাংবাদিক।” এই বক্তব্যের ভেতর দিয়ে তিনি মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটকে তুলে ধরেছেন—পেশাদার সাংবাদিকতা এবং অপেশাদার তথ্যপ্রবাহের মধ্যে সীমারেখা দিন দিন অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকতা: একটি পেশা নয়, একটি দায়িত্ব সাংবাদিকতা কখনোই কেবল একটি পেশা ছিল না; এটি ছিল সমাজের প্রতি এক গভীর দায়িত্ব। একজন প্রকৃত সাংবাদিক সত্য অনুসন্ধান করেন, তথ্য যাচাই করেন এবং সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেন। তিনি ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যকে তুলে ধরেন, সমাজের অসংগতি প্রকাশ করেন এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই দায়িত্ববোধ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। মোবাইল ক্যামেরা, লাইভ ভিডিও এবং দ্রুত শেয়ার করার প্রবণতা অনেক সময় সত্য যাচাইয়ের আগেই তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি—সত্য ও নির্ভুলতা—প্রায়ই উপেক্ষিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আশীর্বাদ নাকি চ্যালেঞ্জ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিঃসন্দেহে তথ্যপ্রবাহকে দ্রুত করেছে। দূর-দূরান্তের খবর মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে। এটি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। আজ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়—যাচাই না করেই একটি ভিডিও বা ছবি শেয়ার করা হচ্ছে, যা পরে বিভ্রান্তি, গুজব এমনকি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। “ভাইরাল” হওয়াই যেন এখন সংবাদযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে গেছে। কিন্তু ভাইরাল হওয়া মানেই সত্য নয়—এটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। পেশাদার সাংবাদিকতার অবক্ষয় মতিউর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যে যে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা মূলত পেশাদার সাংবাদিকতার অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। আজ অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিকতার জন্য যে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ প্রয়োজন, তা অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত।
ফলে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ঘটছে— যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ উপস্থাপন ক্লিকবেইট শিরোনামের ব্যবহার ব্যক্তিগত মতকে সংবাদ হিসেবে প্রচার এই প্রবণতাগুলো সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাংবাদিকতার আসল সংকট কোথায়? আসল সংকট প্রযুক্তি নয়, বরং প্রযুক্তির অপব্যবহার। মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমস্যার মূল নয়; সমস্যা হলো এর ব্যবহারকারী মানুষের নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি। একজন প্রশিক্ষিত সাংবাদিক জানেন কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হয় এবং কীভাবে একটি সংবাদকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু “হঠাৎ সাংবাদিক”রা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান না। তথ্যের ভিড়ে সত্যের সংকট
আজকের যুগকে বলা হয় “Information Explosion Era”—অর্থাৎ তথ্যের বিস্ফোরণের যুগ। কিন্তু এই তথ্যের ভিড়ে সত্য প্রায়ই হারিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না কোন তথ্য সত্য, কোনটি গুজব। এখানেই প্রকৃত সাংবাদিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেবল তথ্য দেন না, তিনি তথ্যকে বিশ্লেষণ করে সত্যকে আলাদা করে উপস্থাপন করেন। তাই সাংবাদিকতা কেবল খবর দেওয়া নয়, বরং সত্যের প্রহরী হওয়া। ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা কেমন হওয়া উচিত?
মতিউর রহমান চৌধুরীর বক্তব্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—সাংবাদিকতা কি তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে? উত্তর হলো, না। সাংবাদিকতা শেষ হচ্ছে না, বরং নতুন রূপ নিচ্ছে। তবে সেই নতুন রূপকে সঠিক পথে নিতে হলে কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি— পেশাগত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চা করা তথ্য যাচাইকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করা সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য স্পষ্ট রাখা সমাজের দায়বদ্ধতা শুধু সাংবাদিক নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষেরও দায়িত্ব আছে। কারণ আজকের যুগে সবাই তথ্যের অংশীদার। একটি শেয়ার করা পোস্টও সমাজে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তথ্য গ্রহণের আগে যেমন যাচাই প্রয়োজন, তেমনি তথ্য ছড়ানোর আগে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। মতিউর রহমান চৌধুরীর বক্তব্য আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি কখনো বদলায় না। সেই ভিত্তি হলো সত্য, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ। আজকের এই ডিজিটাল যুগে যদি আমরা সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে চাই, তাহলে শুধু প্রযুক্তিকে নয়, নিজের নৈতিক অবস্থানকেও শক্ত করতে হবে। কারণ সাংবাদিকতা শেষ হয়ে যায় না—শেষ হয়ে যায় দায়িত্ববোধহীন সাংবাদিকতা। সত্যের পথে দাঁড়ানোই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সাহস, আর সেই সাহসই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি।


