
মো. কামাল উদ্দিন
বছরের শুরু মানেই আমার কাছে শুধু নতুন দিনের সূচনা নয়—এটা এক অদৃশ্য ক্ষতের আবারও রক্তক্ষরণ। সময়ের ক্যালেন্ডার বদলায়, পাতা উল্টায়, নতুন তারিখ আসে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা স্মৃতিরা কখনো পুরনো হয় না। বরং প্রতিটি নতুন বছরের আলো এসে সেই পুরনো কষ্টকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই সময়টাতেই আবারও খুলে যায় হৃদয়ের গভীরতম কষ্টের দরজাটা। স্মৃতিরা একে একে এসে দাঁড়ায়, যেন নীরব কোনো শোকসভায় তারা অপেক্ষমাণ। আর তাদের মাঝখানে তুমি—আমার একান্ত বন্ধু, ক্যাপ্টেন আহমেদ মাসুক হাসান। তোমার নাম উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতরটা আজও অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে। মনে হয়, যেন কোনো অদৃশ্য ঢেউ এসে ভেঙে দেয় হৃদয়ের উপকূল। সমুদ্রের বিশালতা, তার গম্ভীর নীরবতা—সবকিছুই আজ তোমার স্মৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। কখনো মনে হয়, সমুদ্রও যেন আজ আর আগের মতো গর্জন করে না; সে-ও বুঝি তোমার অনুপস্থিতির ভার বহন করছে। ২০২১ সালের সেই নির্মম সময়… করোনার কালো ছায়া যখন পৃথিবীকে গ্রাস করেছিল, চারপাশে তখন শুধু মৃত্যুর নীরব পদধ্বনি, আতঙ্ক আর বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস। ঠিক সেই অন্ধকার সময়েই তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে। এত দ্রুত, এত নীরবে—যেন দায়িত্ব শেষ করে কোনো এক ক্লান্ত নাবিক সমুদ্রযাত্রা শেষে চুপচাপ নোঙর ফেলে দিয়েছে চিরবিদায়ের বন্দরে। তুমি শুধু একজন নৌবাহিনীর অফিসার ছিলে না—তুমি ছিলে এক স্বপ্নের নাম, এক দীপ্ত সম্ভাবনা, এক গর্বিত প্রতিশ্রুতি। তোমার চোখে আমি দেখেছি অদম্য সাহসের আলো, তোমার কথায় শুনেছি দায়িত্ববোধের দৃঢ়তা, আর তোমার উপস্থিতিতে অনুভব করেছি নেতৃত্বের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য। মনে হতো, সময় তোমাকে একদিন এই দেশের নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যাবে—সেই যোগ্যতা, সেই মেধা, সেই দীপ্তি তোমার ভেতরে সম্পূর্ণরূপে ছিল। কিন্তু জীবন সবসময় ন্যায়ের গল্প লিখে না। ভাগ্য কখনো কখনো নির্মম অধ্যায় রচনা করে। তোমার জীবনের শেষ সময়গুলোতে যে বৈষম্য, যে অবহেলা, যে অদৃশ্য যন্ত্রণা তোমাকে স্পর্শ করেছিল—তা আজও আমাকে গভীরভাবে আহত করে। একজন দেশপ্রেমিক, একজন নিবেদিতপ্রাণ অফিসার—তার প্রাপ্য সম্মান যদি জীবদ্দশায় সম্পূর্ণভাবে না পায়, তবে সেটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের ইতিহাস হয়ে থাকে। আজ তোমার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচটি বছর পার হয়ে গেছে—কিন্তু সময় এখানে কোনো চিকিৎসক হতে পারেনি। বরং সময় যেন শুধু একটি সাক্ষী, যে নীরবে দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছে আমার ভেতরের অশ্রুভেজা স্মৃতিগুলো। মনে হয়, সবকিছুই যেন গতকালের ঘটনা—তোমার হাসি, তোমার কথা, তোমার স্বপ্ন নিয়ে আমাদের আড্ডা। বন্ধু, তুমি ছিলে আমার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যাকে কোনো দিন সম্পূর্ণভাবে শেষ করা যায় না। তোমাকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়—এটা ছিল আমার নিজের ভেতরের এক অংশ হারিয়ে ফেলা। তাই বছরের শুরু এলেই মনে হয়, নতুন কিছু শুরু হচ্ছে না—বরং পুরনো এক শূন্যতা আবার নতুন করে জেগে উঠছে, আরও গভীরভাবে, আরও নীরবে। আজও অনেক সময় মনে হয়, তুমি কোথাও দূরে নেই। তুমি আছো—সমুদ্রের গভীর নীল জলে, আকাশের অসীম বিস্তারে, কিংবা সৃষ্টিকর্তার অদৃশ্য স্নেহময় ছায়ায়। হয়তো তুমি এখন সেই জায়গায়, যেখানে কোনো কষ্ট নেই, কোনো অবহেলা নেই, কোনো বৈষম্যের ছায়া নেই। শুধু শান্তি আছে—অসীম, অনন্ত শান্তি। কিন্তু আমার পৃথিবীতে তুমি আছো ভিন্নভাবে। তুমি আছো আমার প্রতিটি লেখার ভেতরে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে, প্রতিটি নির্জন সন্ধ্যায়। কখনো হঠাৎ রাত গভীর হলে মনে হয়, তুমি বুঝি আবার ডাকছো—কোনো দূর সমুদ্র থেকে, কোনো নীরব ঢেউয়ের আড়াল থেকে। বন্ধু, আজ তোমার জন্য শুধু একটাই প্রার্থনা— আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। তোমার আত্মা থাকুক চিরশান্তির আলোয় আলোকিত। আর আমি… আমি এখনো স্মৃতির ভেলায় ভেসে তোমাকে খুঁজি। প্রতিটি বছরের শুরুতে, প্রতিটি নিঃশব্দ রাতে, প্রতিটি গভীর একাকীত্বে। সময় যতই এগিয়ে যাক, পৃথিবী যতই বদলে যাক—তুমি কখনো দূরে যাবে না। তুমি ছিলে, আছো, থাকবে— আমার হৃদয়ের গভীরতম, নীরবতম সমুদ্রতলে।

