বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচারকদের বদলি ও পদায়নে দলীয় আনুগত্যকে প্রধান বিবেচনা করা হতো বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, যারা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, তাদের অনেক ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করে কার্যত শাস্তি দেওয়া হতো। বর্তমান সরকার সেই ধারা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৫তম দিনের আলোচনায় চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী জানান, অতীতে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখতে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক বাধা না থাকলেও বাস্তবে দলীয় বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এখন থেকে বিচারকদের সততা, দক্ষতা ও বিচারিক আচরণই হবে মূল্যায়নের মূল মানদণ্ড। আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে সুপারিশ পাঠালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে; এ ক্ষেত্রে সরকারের একক কোনো কর্তৃত্ব নেই। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন-২০২৬ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, নতুন আইনে এসএমএস ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল এবং সরাসরি জেরা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ডিক্রি জারির জন্য আলাদা মামলা দায়েরের পরিবর্তে মূল মামলাতেই আবেদন করার সুযোগও সংযোজন করা হয়েছে। মামলার জট কমাতে ইতোমধ্যে ৮৭১টি আদালত ও ২৩২ জন বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে এবং ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া বিচার বিভাগীয় বিভিন্ন শূন্যপদে ৭০৮ জন কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং আরও ৫৫৩ জন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। আইনমন্ত্রী বলেন, সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো এবং মামলার জট নিরসনে সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করছে। বিএনপি দলীয় এমপি ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের অপ্রাসঙ্গিক আইনগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে ল কমিশন কাজ করছে। সরকার দলীয় এমপি মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে ৪৬৭ জন বিচারককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৯৩ জন বিচারক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দুই জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালু রয়েছে, যেখানে মামলা দায়ের থেকে শুনানি পর্যন্ত সব কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ কমছে এবং বিশেষ করে নারী, শিশু ও দূরবর্তী এলাকার মানুষ সহজে বিচার পাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে এটি সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটাল রূপ দিতে ‘ই-জুডিশিয়ারি’ প্রকল্পও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, মামলার এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ না থাকায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা মামলার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। সরকার দলীয় এমপি মনোয়ার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ জন্য গঠিত কমিটি কাজ করছে। তবে নীতিগতভাবে কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। এছাড়া এমপি রফিকুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তিতে গড় সময় নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি। তবে ফৌজদারি মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন এবং দায়রা আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী সময় ভিন্ন হতে পারে—কিছু মামলা এক বছরে নিষ্পত্তি হলেও জটিল ক্ষেত্রে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।

