
মো.কামাল উদ্দিনঃ
প্রথম পর্যবেক্ষণের উত্তেজনা, দায়িত্বের ভার—নির্বাচনের প্রহরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কিছু কথা আগামীকাল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণতন্ত্রের দীর্ঘ যাত্রাপথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সারা দেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ভিড়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার গণমাধ্যমকর্মী নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে হয়তো এই প্রথমবারের মতো এই দায়িত্ব হাতে পেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের চোখে থাকবে এক ধরনের উচ্ছ্বাস, মনে থাকবে গর্বের আলো—কারণ এটি কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি গণতন্ত্রের এক নীরব প্রহরী হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ। আমি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে আসছি ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে। সেই প্রথম দিনের উত্তেজনা, অজানা দায়িত্বের রোমাঞ্চ, ভোট কেন্দ্রের ভেতর-বাহিরে মানুষের মুখের ভাষা পড়ার চেষ্টা সব আজও স্পষ্ট মনে আছে। সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বেড়েছে, দায়িত্বের গভীরতা উপলব্ধি করেছি আরও নিবিড়ভাবে। দেশের বাইরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগও হয়েছে।

আবার বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আহসান আরিফ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ১৫ দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক টিমের সঙ্গে কাজ করেছি। আমাদের দলে ছিলেন জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। দেশের পক্ষ থেকে সদ্য বিদায়ী এটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান সাহেবসহ আরও অনেকে যুক্ত ছিলেন। আমার বন্ধু মোজাম্মেল হক চৌধুরী ও নিপু—যিনি এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক—তিনিও ছিলেন সেই অভিজ্ঞতার অংশ। সে সময় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা কীভাবে প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয় খেয়াল করেন ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটারদের স্বাধীন চলাচল, নারীদের অংশগ্রহণ, প্রতিবন্ধী ভোটারদের সুযোগ, এমনকি কেন্দ্রের ভেতরে কর্মকর্তাদের আচরণ পর্যন্ত। তারা আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে কথা বলেন; অনুমান দিয়ে নয়, পর্যবেক্ষণ দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আজ যখন নতুন প্রজন্মের বহু গণমাধ্যমকর্মী প্রথমবারের মতো এই দায়িত্ব পাচ্ছেন, তখন একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মানে কোনো পক্ষের প্রশংসা বা সমালোচনায় তৎপর হওয়া নয়। এটি হলো নিরপেক্ষ চোখে বাস্তবতা দেখা, যাচাই করা এবং সত্যকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। অনেকেই হয়তো জানেন না, কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই সংক্ষেপে কিছু কথা— প্রথমত, পর্যবেক্ষক হিসেবে আপনার পরিচয়পত্রই আপনার প্রধান শক্তি। কিন্তু তার চেয়েও বড় শক্তি আপনার সততা ও পেশাগত নৈতিকতা। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে কোনো অনিয়ম দেখলে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রচার না করে প্রথমে যাচাই করুন। একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হন। তৃতীয়ত, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখুন। আপনার ভাষা যেন কখনও পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করে। চতুর্থত, ভোটারদের সম্মান করুন। তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করুন। পঞ্চমত, পর্যবেক্ষণ মানে কেবল সমস্যা খোঁজা নয়—ভাল ব্যবস্থাপনা, সুশৃঙ্খল পরিবেশ, ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরা সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের এই দিনে আমরা কেবল সংবাদকর্মী নই—আমরা ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। আগামী দিনের গবেষক, বিশ্লেষক, ইতিহাসবিদ হয়তো আমাদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে একটি সময়কে বিচার করবেন।
তাই দায়িত্বটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রথমবার যারা যাচ্ছেন, তাদের আনন্দ থাকুক—সেটিই স্বাভাবিক। তবে মনে রাখবেন, এই আনন্দের সঙ্গে আছে এক গভীর দায়বদ্ধতা। ভোটকেন্দ্রের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি আচরণ—সবই আপনার বিবেকের আয়নায় ধরা পড়বে। আমি ১৯৯১ থেকে আজ পর্যন্ত একটি জিনিস শিখেছি—নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার নীরব পরীক্ষক হিসেবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সবার জন্য শুভকামনা। দায়িত্বশীল থাকুন, নিরপেক্ষ থাকুন, সত্যের প্রতি অবিচল থাকুন। গণতন্ত্রের এই প্রহরে আমরা যেন সত্যিকারের প্রহরী হয়ে উঠতে পারি—এই প্রত্যাশাই রইল। গণতন্ত্রের প্রহরায় সংবাদমাধ্যম-জাতীয় নির্বাচনে সাংবাদিকদের দায়িত্ব, অধিকার ও করণীয় — একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকাজাতীয় নির্বাচন কেবল ভোট দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শক্তি, জনগণের মত প্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম এবং রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সাংবাদিকরা শুধু খবর সংগ্রহ করেন না—তাঁরা গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের চোখে ধরা পড়ে মাঠের বাস্তবতা, তাঁদের কলমে উঠে আসে ভোটারের কণ্ঠস্বর, তাঁদের ক্যামেরায় বন্দী হয় ইতিহাসের মুহূর্ত। তাই নির্বাচনের সময় সাংবাদিকতার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়—এটি হয়ে ওঠে পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও সাহসের সম্মিলিত পরীক্ষা। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনকালীন সময়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আগে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন বা বিশেষ পরিচয়পত্র প্রদান করে। এই অনুমোদনপত্র থাকলে সাংবাদিকরা নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্র বা গণনা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেন। নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্রের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত কার্ড বহন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমতি ছাড়া ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করা আইনত সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে কেন্দ্রের বাইরে—ভোটারদের সারি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জনমত বা আশপাশের পরিবেশ—এসব বিষয়ে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন, যতক্ষণ তা নির্বাচন আচরণবিধি ভঙ্গ না করে। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। সাংবাদিককে প্রথমে প্রেসাইডিং অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং তাঁর অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। ভোটগ্রহণের সময় ভোটারদের গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। গোপন ব্যালট কক্ষে ছবি বা ভিডিও ধারণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভোটারের পছন্দ বা ভোটদানের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। অনেক সময় ভোটকক্ষে লাইভ সম্প্রচার সীমিত বা নিষিদ্ধ থাকে, কারণ তা ভোটগ্রহণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো এমনভাবে কাজ করা যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়।

আইনগতভাবে সাংবাদিকরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করেন, যা সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। তবে এই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ সীমাহীন নয়। নির্বাচন আচরণবিধি, দণ্ডবিধি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। কোনো ধরনের উসকানিমূলক, পক্ষপাতমূলক বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার করলে তা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই নির্বাচনের সময় তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ফলে সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো তথ্য প্রকাশের আগে নিশ্চিত হওয়া—তা সত্য, নির্ভুল ও প্রমাণনির্ভর কি না। একজন দক্ষ নির্বাচনী সাংবাদিকের কিছু মৌলিক গুণ থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, তাঁকে নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা মতাদর্শের প্রতি পক্ষপাত দেখানো পেশাগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত, তাঁকে নির্বাচন আইন ও আচরণবিধি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে কাজ করার সময় ধৈর্য ও সংযম অত্যন্ত প্রয়োজন, কারণ নির্বাচনী পরিবেশ অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে। চতুর্থত, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা থাকা অপরিহার্য। একটি ভুল তথ্য পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় চল্লিশটির মতো টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার করছে। নিবন্ধিত দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকার সংখ্যা কয়েকশ। অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, যেগুলোর অনেকগুলো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত। তবে সক্রিয় ও পেশাদার গণমাধ্যমের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। এই বৃহৎ মিডিয়া পরিসরে নির্বাচনের সময় প্রতিযোগিতা বাড়ে, কিন্তু দায়িত্বও বাড়ে। দ্রুততার সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের চাপে পড়ে অনেক সময় যাচাই প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়—যা এড়িয়ে চলা উচিত। নির্বাচনের সময় সাংবাদিকতার কাজ কেবল ভোটকেন্দ্রের ছবি প্রকাশ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটার উপস্থিতির হার, গণনা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ফল ঘোষণার সঠিকতা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব বিষয় তুলে ধরা হলে নির্বাচন আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়। তবে বাস্তবতায় সাংবাদিকরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাধা, এমনকি কখনো কখনো শারীরিক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সচেতনতা থাকা জরুরি। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে একা কাজ না করা, পরিচয়পত্র দৃশ্যমান রাখা এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সবশেষে বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনে সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সততা ও দায়িত্ববোধ। একটি সঠিক ও প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, তেমনি একটি অসত্য বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের কাজ হওয়া উচিত—নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বাস্তবতা দেখা, যাচাই করে তথ্য প্রকাশ করা এবং জনগণের আস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাংবাদিক যদি সচেতন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার থাকেন, তবে নির্বাচন শুধু একটি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নয়—এটি হয়ে উঠবে জনগণের আস্থার উৎসব।


