
মো কামাল উদ্দিনঃ
বোয়ালখালীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহেদুল হকের গ্রেপ্তারের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। এই গ্রেপ্তার কেবল একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ন্যায়বোধের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বোয়ালখালীর আনাচে-কানাচে, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক আলোচনায়—একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে: এই ঘটনা কি প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা, নাকি প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিগত বিরোধের বহিঃপ্রকাশ? জাহেদুল হক বোয়ালখালীর মানুষের কাছে বহুদিন ধরেই একজন মানবিক ও সমাজকর্মী হিসেবে পরিচিত। জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগেও, ব্যবসায়ী জীবনেও, তাকে গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীরবে, প্রচারের বাইরে। শিক্ষা, চিকিৎসা, দুর্যোগকালীন সহায়তা কিংবা পারিবারিক সংকটে—তার সহায়তার কথা স্থানীয়রা বারবার উল্লেখ করছেন। এই মানবিক পরিচয়ের কারণেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও একাধিক মামলার বিষয়টি অনেকের কাছে হঠাৎ ও বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। এলাকাবাসীর একটি বড় অংশের অভিযোগ, জাহেদুল হকের বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলোর পেছনে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে সৎ ভাইদের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত শত্রুতাকে আইনি ও রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে—এমন ধারণা স্থানীয় পর্যায়ে জোরালো। যদি ব্যক্তিগত বিরোধ রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, তবে তা শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগজনক। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার রাজনৈতিক পরিচয়। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, জাহেদুল হক কোনো ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় রাজনীতি করা ব্যক্তি নন। তার পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম লীগ ঘরানার এবং তারা কখনোই আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ফলে ‘বিগত সরকারের প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়া’ সংক্রান্ত অভিযোগ কতটা তথ্যভিত্তিক, আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। ভুলে গেলে চলবে না, জাহেদুল হক ভোটের মাধ্যমেই উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই ভোট ছিল বোয়ালখালীর মানুষের আস্থা, প্রত্যাশা ও মূল্যায়নের প্রতিফলন। একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে—এটাই স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই তদন্ত যদি জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে, প্রমাণের বদলে অনুমান বা প্রতিহিংসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে। একই সঙ্গে এটাও সত্য—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা অতীতের মানবিক কাজ কোনো অপরাধের দায় থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না। যদি জাহেদুল হক বা অন্য যে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে তার বিচার হওয়াই উচিত। তবে সেই বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। অভিযোগের পাহাড় নয়, প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। আজ যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো মামলার সংখ্যা ও গ্রেপ্তারের ধরন। একাধিক মামলায় জড়িয়ে পড়া, বিভিন্ন থানায় অভিযোগ—এসব দেখে অনেকেই মনে করছেন, এটি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক গতি নয়, বরং চাপ প্রয়োগের কৌশল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব এখানে আরও সংবেদনশীল। কারণ, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই জনমনে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনে একতরফা অভিযোগ বা অনুমানকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ন্যায়বিচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির অতীত কাজ, সামাজিক অবদান এবং জনমতকেও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা সাংবাদিকতার দায়িত্বের অংশ। রাষ্ট্রের কাছে বোয়ালখালীর মানুষের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট—এই মামলাগুলোর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত। সত্য অপরাধী হলে শাস্তি হোক, আর যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তবে যেন একজন মানুষ তার সম্মান ও অধিকার ফিরে পান। বিচার দীর্ঘায়িত হলে বা প্রশ্নবিদ্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। জাহেদুল হক প্রসঙ্গ আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলাদেশে রাজনীতি ও আইনের সম্পর্ক এখনো কতটা সংবেদনশীল। এখানে ন্যায়বিচারকে প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে তুলে আনাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ, ন্যায়বিচার তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা কিংবা শত্রুতার হিসাব নয়—সত্য, প্রমাণ ও সুবিবেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
লেখকঃনির্বাহী সম্পাদক- চট্রল চিত্র, ডেপুটি এডিটর দি টুরিস্ট পত্রিকা।


