― Advertisement ―

প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের বর্ষবরণ ও গুনীজন সংবর্ধনা সম্পন্ন

স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে : রাউজান উপজেলার পুর্বআবুরখীল তালুকদারপাড়ায় অবস্থিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে নববর্ষ বরণ, গুনীজন সংবর্ধনা ও...

“স্বাধীনতার স্মৃতি, মানুষের গল্প”—আমেরিকান লেখক ফিলিপ ওয়ালশের সঙ্গে তিন প্রজন্ম ছুঁয়ে যাওয়া এক দীর্ঘ আলাপন–

Homeচট্টগ্রাম“স্বাধীনতার স্মৃতি, মানুষের গল্প”—আমেরিকান লেখক ফিলিপ ওয়ালশের সঙ্গে তিন প্রজন্ম ছুঁয়ে যাওয়া...

মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের আকাশে তখন সন্ধ্যার রঙ ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছিল। ২৭শে মার্চের সেই বিকেলটি ছিল যেন এক অদৃশ্য আবেগে মোড়া—স্বাধীনতার স্মৃতি, ইতিহাসের ব্যথা, আর নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আয়োজিত স্বাধীনতা বই উৎসব ও বিশ্ব নাট্য দিবস উপলক্ষে চারদিকে মানুষের ঢল, বইয়ের ঘ্রাণ, আর সংস্কৃতির নানান রঙিন প্রকাশ। এই জনারণ্যের মধ্যেই আমার চোখে পড়লেন এক ভিন্নধর্মী মানুষ—শান্ত, গভীর, পর্যবেক্ষণশীল। তার দৃষ্টিতে যেন সময়ের বহু স্তর জমাট বেঁধে আছে। তিনি ফিলিপ ওয়ালশ—একজন আমেরিকান লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, এবং ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। প্রথম আলাপ: পরিচয়ের ভেতর দিয়ে আত্মার সংযোগ আমি এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম—একজন লেখক, সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক এবং PEN International-এর সদস্য হিসেবে। আমার কথা শুনে তার চোখে যে আলো জ্বলে উঠল, তা ছিল নিছক সৌজন্য নয়—বরং এক ধরনের আত্মীয়তার অনুভব। তিনি মৃদু হেসে বললেন— “লেখকরা কখনো অপরিচিত থাকে না, আমরা সবাই একই গল্পের ভিন্ন চরিত্র।” আমার অনুরোধে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সম্মতি দিলেন। আমাদের পাশে ছিলেন সাংবাদিক স. ম. জিয়াউর রহমান, এবং বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি শিক্ষক মানিকদে সহ আরও কয়েকজন। চারপাশে তখনও অনুষ্ঠান চলছিল, কিন্তু আমাদের ছোট্ট পরিসরে শুরু হলো এক গভীর আলাপন—যার প্রতিটি শব্দ যেন ইতিহাসের গায়ে হাত রেখে উচ্চারিত হচ্ছিল। বংশপরিচয়: এক মানুষের নয়, এক আদর্শের উত্তরাধিকার
ফিলিপ ওয়ালশের গল্প শুরু হয় তার পিতা—David J. Walsh-কে দিয়ে। তিনি শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন মানবসেবক, একজন বিশ্বাসী মানুষ, যিনি সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। পাকিস্তান আমলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং দায়িত্ব নেন দুলাহাজারা খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে। ফিলিপ বললেন— “আমার বাবার কাছে দেশ মানে ছিল না কোনো মানচিত্র—দেশ মানে ছিল মানুষ।” এই একটি বাক্য যেন পুরো পরিবারটির মানসিক কাঠামো বুঝিয়ে দেয়। লাহোরে জন্ম, কিন্তু হৃদয়ের টান পূর্ববাংলায় ফিলিপের জন্ম লাহোরে হলেও তার শৈশবের স্মৃতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পূর্ববাংলা—আজকের বাংলাদেশ। “আমি লাহোরে জন্মেছি, কিন্তু আমার শৈশবের গন্ধ, শব্দ, অনুভূতি—সবই এই বাংলার।”
তার কণ্ঠে তখন এক ধরনের নস্টালজিয়া, যা কেবল স্মৃতির নয়—এক ধরনের আত্মপরিচয়েরও। ১৯৭১: এক শিশুর চোখে যুদ্ধের নির্মমতা যুদ্ধের প্রসঙ্গে আসতেই তিনি কিছুটা থেমে গেলেন। যেন স্মৃতির দরজা খুলতে একটু সময় লাগছে। “রাতের বেলা হঠাৎ গুলির শব্দ, মানুষের দৌড়, ভয়ের চিৎকার—এসব আমি ভুলতে পারি না।” তার পিতা তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া, আশ্রয় দেওয়া, এমনকি কখনো কখনো নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা—সবই ছিল তার দৈনন্দিন কাজের অংশ। “আমার বাবা বলতেন—মানুষকে বাঁচানোই সবচেয়ে বড় ধর্ম।” মিয়ানমারে আশ্রয়: উদ্বাস্তু জীবনের নিঃশব্দ কান্না যুদ্ধের তীব্রতা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তাদের পরিবারকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়।
তারা আশ্রয় নেয় মিয়ানমারে। “একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো নিজের ঘর হারানো।” তিনি বললেন—
“আমরা শুধু দেশ ছাড়িনি, আমরা আমাদের শৈশবের একটি অংশ হারিয়েছি।” স্বাধীনতার পর: ফিরে আসা, নতুন স্বপ্ন দেখা
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা আবার ফিরে আসে। সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তার পিতার সঙ্গে Sheikh Mujibur Rahman-এর সাক্ষাৎ। “বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাবার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন নিয়ে।” তিনি বললেন— “বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়—তিনি কেবল রাজনীতিবিদ নন, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা।” ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙন ও পুনর্গঠন জীবনের পথে ফিলিপও কম ঝড়ের মুখোমুখি হননি। আমেরিকায় তার বৈবাহিক জীবনের ইতি ঘটে। তিন সন্তানের পিতা হয়েও তিনি একসময় নিজেকে একা খুঁজে পান। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না।
বাংলাদেশে এসে, চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকার এক খ্রিস্টান বাঙালি নারীকে বিয়ে করেন। এই নতুন সম্পর্ক যেন তার জীবনে নতুন আলো নিয়ে আসে। “বাংলাদেশ আমাকে দ্বিতীয়বার বাঁচার সুযোগ দিয়েছে।” বাংলাদেশ: এক বিদেশির চোখে নিজের দেশ
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম— “বাংলাদেশ আপনার কাছে কী?” তিনি একটু ভেবে বললেন— “এটি আমার দ্বিতীয় জন্মভূমি—যেখানে আমি শুধু থেকেছি না, আমি অনুভব করেছি।” তার কাছে বাংলাদেশের মানুষ, তাদের আতিথেয়তা, তাদের সংগ্রাম—সবই এক ধরনের অনুপ্রেরণা। লেখক হিসেবে দর্শন: মানুষের গল্পই ইতিহাস ফিলিপ ওয়ালশের লেখালেখির মূল বিষয় হলো মানুষ। তিনি ইতিহাসকে দেখেন মানুষের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। “ইতিহাস বইয়ে থাকে, কিন্তু মানুষের গল্প হৃদয়ে থাকে।”
তার লেখায় যুদ্ধ, অভিবাসন, পরিচয়ের সংকট—সবকিছুই উঠে আসে এক গভীর মানবিক বোধের মাধ্যমে। সাংবাদিকতা: সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা সাংবাদিক হিসেবে তিনি মনে করেন— “সত্য বলা কখনো সহজ নয়, কিন্তু সেটাই একমাত্র পথ।” আমি যখন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বললাম, তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন— “আপনারা যারা লিখছেন, তারা শুধু সংবাদ দিচ্ছেন না—আপনারা ইতিহাস লিখছেন।” চট্টগ্রাম: স্মৃতির শহর, ভালোবাসার শহর চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ উঠতেই তার কণ্ঠে আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। “এই শহরে আমার বাবার পদচিহ্ন আছে, আমার শৈশবের হাসি আছে, আমার জীবনের নতুন অধ্যায় আছে।” পাথরঘাটা, দুলাহাজারা—এসব জায়গার নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে তিনি যেন সময়ের ভেতর হারিয়ে যান। মানুষের ভেতরের যুদ্ধ: এক নীরব দর্শন তিনি বললেন— “প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই একটি যুদ্ধ চলে—নিজের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে।” এই কথাগুলো যেন শুধু তার নিজের নয়—আমাদের সবার গল্প। শেষ প্রশ্ন: স্বাধীনতার সংজ্ঞা
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম— “আপনার কাছে স্বাধীনতা কী?” তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“স্বাধীনতা মানে শুধু শত্রুর হাত থেকে মুক্তি নয়— স্বাধীনতা মানে নিজের ভয় থেকে মুক্তি, নিজের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া।”
শেষ অনুরণন: এক বিকেলের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি সেদিনের সেই সাক্ষাৎকার শেষ হলেও, তার প্রতিটি কথা আজও মনে প্রতিধ্বনিত হয়। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির সেই বিকেলটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না— এটি ছিল ইতিহাস, মানবতা, এবং ভালোবাসার এক জীবন্ত দলিল। ফিলিপ ওয়ালশ— একজন আমেরিকান হয়েও যিনি হৃদয়ে ধারণ করেন বাংলাদেশকে, যিনি প্রমাণ করেছেন— মানুষের পরিচয় তার জন্মস্থানে নয়, তার অনুভূতিতে। শেষে তিনি আমাকে বলেছিলেন— “আপনি লিখবেন, কারণ আপনার লেখা হয়তো কারো হৃদয়ে আলো জ্বালাবে।” আমি ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম— হয়তো এই লেখাটিই সেই আলো জ্বালানোর একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস…