
মানবসভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথে কোনো কোনো মুহূর্তে আবির্ভূত হন এমন কিছু বিরল মানব—যাঁদের জীবনালোক একক মানবজীবনের সীমা অতিক্রম করে ছুঁয়ে যায় বৃহত্তর সমাজকে, ছুঁয়ে যায় এক সমগ্র জাতির মানসজগৎকে। তাঁরা জন্মান যুগের প্রয়োজনেই; সময় তাঁদের আহ্বান জানায়, ইতিহাস তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট রাখে একটি বিশেষ আসন। পরম পূজ্য ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরো সেই বিরল মহিমান্বিত মানুষের একজন—যাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করা মানে শান্তি, সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও আলোকময়তার এক নতুন ভুবনে প্রবেশ করা। সমকালীন বিশ্বে যখন বিভাজন, আক্রোশ, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও স্বার্থপরতা মানবজীবনের চারপাশে ঘন অন্ধকারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, তখনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা অন্ধকার ভেদ করে জ্বালিয়ে দেন আশার প্রদীপ। পরম পূজ্য মহাথেরো তাঁদেরই একজন—যাঁর জীবনশিল্প গঠিত হয়েছে শান্তি-সাধনা, সদ্ধর্ম প্রচার, শিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা ও বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বিশাল কর্মযজ্ঞ। ভিক্ষুসংঘ ও দায়ক- দায়িকার চিকিৎসা তহবিল গঠন। তিনি একজন মাত্রামানব—অর্থাৎ এমন মানুষ, যিনি নিজের জন্য নয়; অন্যের কল্যাণের জন্য বাঁচেন। নিজের মুক্তি নয়; সমগ্র জীবের মুক্তিকেই তিনি জীবনের মূল লক্ষ্য বলে মেনে চলেন। সমাজনির্মাণের সূক্ষ্ম শিল্পে এক মহৎ স্থপতি :- ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরোর সামাজিক ভূমিকা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা সাংঘিক কাঠামোর ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সমাজকে দেখেছেন সমগ্রতার দৃষ্টিতে—মানুষের দুঃখ, মানুষের ক্ষত, মহান সংঘের সেবা, মানুষের স্বপ্ন, মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের মুক্তিপথ—এই সবকিছুর জটিল সমীকরণে- বুননে। তাঁর কর্মযজ্ঞের পরিধি তাই দিগন্ত বিস্তৃত। তিনি সংগঠনকে ট্রাস্টে গড়ে তুলেছেন আর্থিক ভিত্তির ওপর, যুক্তি ও বৌদ্ধিক প্রজ্ঞার আলোয়। মানুষের মধ্যে যে অনৈক্য, বিভাজন, ভেদবুদ্ধি—তার অবসান তিনি চান সহমর্মিতার শক্তিতে। তাঁর কাছে সমাজ মানে শুধু জনসমষ্টি নয়;সমাজ মানে আত্মমর্যাদায় জাগ্রত মানুষ,সমাজ মানে প্রশান্ত হৃদয়ের সাম্য , মৈত্রী ও করুণা ধারা।সমাজ মানে পরস্পরকে ধারণ করার শক্তি। আঘাত আসলে সহজ সরল অভিব্যক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া, সহ্য করা। সাম্যাবস্থা রক্ষা করা।একজন প্রকৃত সংগঠকের প্রধান শক্তি হলো মানুষের মন জয় করা, তাদের সত্য পথে ডেকে আনা, এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। পূজ্য মহাথেরো সেই দায়িত্ব পালন করেছেন অনায়াসে, সৌম্যভাবে, প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে। তাঁর কথা মৃদু; কিন্তু তা মানুষের হৃদয়ে প্রবাহিত হয় নির্মল জলের মতো—যা দগ্ধ হৃদয়কে শান্ত করে, উদ্বিগ্ন মনকে স্থির করে।সদ্ধর্মের আলোকে মানুষের উত্তরণ :-তিনি সব সময় বলেন,”একমাত্র
বৌদ্ধ ধর্মকেব সদ্ধর্ম বলে।” গৌতম বুদ্ধ নিজের আর্য দৃষ্টিকে সদ্ধর্ম বলেছেন। যামূলত মানুষের অভ্যন্তর পরিবর্তনের শিক্ষা দেয়। পূজ্য ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরো এই অভ্যন্তর পরিবর্তনকে সমাজ পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি শিক্ষা দেন—মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসে যখন তার হৃদয়ে জাগে অনুকম্পা,তার বুকে জাগে সত্যের সাহস,তার চেতনায় জাগে অহিংসার দীপ্তি। সাধনার আলোকদ্যূতি।তিনি প্রচার করেছেন এমন জীবনযাপন, যেখানে নেই অহংকারের স্থান, নেই লোভের আধিপত্য; আছে সৎকর্মের সঠিক পথ, আছে সম্যক চেতনায় স্থিত প্রশান্ত হৃদয়। তাঁর ভাষণে, তাঁর উপদেশে, তাঁর জীবনাচরণে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পায় মহান বুদ্ধের ‘মধ্যমা প্রতিপদায়’ প্রতিষ্ঠিত জীবনদর্শন।ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরোর ভেতর রয়েছে এক মহাশান্তি—
যা মানুষকে টানে নীরবে, গভীরভাবে। তাঁর কথা মানুষের ভগ্নমানসকে পুনর্গঠিত করে দৃঢ়তায়, বিশ্বাসে। তিনি শিখিয়েছেন—নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়; নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব। নেতৃত্ব মানে শাসন নয়; নেতৃত্ব মানে মানুষকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করা।মানবসেবার পথে এক অনন্য যোদ্ধা :–পূজ্য মহাথেরোর সদ্ধর্ম ও সামাজিক সেবাকর্ম বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তিনি বিশ্বাস করেন—বিহার প্রাঙ্গণে যে শিক্ষা, তা ঘরে-ঘরে পৌঁছাতে না পারলে সমাজে আলো নামবে না। তাই তিনি ” নালন্দ ” নামে শিশুদের বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। মহাসভারমানবিক সহায়তা, চিকিৎসা সেবা, শান্তি উদ্যোগ এবং সংগঠনিক উন্নয়নকে নিজের মিশন হিসেবে নিয়েছেন।তিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নীরবে, অহঙ্কারহীনভাবে। তিনি জানেন—মানুষের দারিদ্র্য শুধু অর্থের দারিদ্র্য নয়; তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা-বঞ্চনা, অবহেলা, সামাজিক অবমাননা, এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা। এসব দূর করতে হলে মানুষের ভেতরে জাগাতে হবে আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান, নৈতিক শক্তি। তিনি সেই কাজ করেছেন ভালোবাসা দিয়ে, সৎসাহসে, আর্যমৌনতায়।মাত্রামানব পরিচয়ের দার্শনিক তাৎপর্য :—যিনি নিজের জীবনের মাত্রা টানেন, তিনিই মাত্রামানব।
ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরো মাত্রামানব।কারণ মাত্রামানব সে-ই—যিনি নিজের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর জীবনদর্শনে স্থিত হন;
যাঁর আত্মত্যাগ কেবল নিজের ধর্মগুরুর আসনে নয়, মানুষের ঘরে-ঘরে আলো ছড়ানোর অঙ্গীকারে প্রতিফলিত হয়;যাঁর কাছে ধর্ম মানে মহান সংঘের সেবা, মানুষের উপকার;আর সংঘটিত সংঘের সেবা, মানুষের উপকারই তাঁর কাছে সর্বোচ্চ ধর্ম।মাত্রামানব হওয়া সহজ নয়; এর জন্য লাগে কঠিন সাধনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সত্যদর্শন, এবং অবিচল মানবপ্রেম। পূজনীয় মহাথেরোর মধ্যে এই চারটি গুণই নির্মলভাবে মিশে আছে।তিনি ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-র পথে চলেছেন নিঃশব্দে।তিনি ‘নিজস্ব’ থেকে ‘সার্বজনীন’-এর পথে হাঁটছেন নীরবে।তিনি ‘ব্যক্তি’-কে অতিক্রম করে ‘মানবসমষ্টি’-র কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।নেতৃত্বের নৈতিকতা ও সুসংস্কৃত দৃষ্টিভঙ্গি :–মানুষের চারিক বৈশিষ্ট্য, মাধুর্য তথা জীবনের সবটুকু সংস্কৃতি। সুসংহত, সংস্কৃতি চর্চার প্রসারিত রূপ এক অনন্য নিদর্শন।আজকের সমাজে নেতৃত্ব পাওয়া কঠিন নয়; কিন্তু নৈতিক নেতৃত্ব, মানবিক নেতৃত্ব, এবং সংগঠনকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়ার দীপ্ত নেতৃত্ব পাওয়া খুবই কঠিন। ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরো সেই বিরল শক্তির অধিকারী।তিনি শিখিয়েছেন—সংগঠন দৃঢ় হয় শাসনে নয়, সংলাপে;সংগঠন এগোয় চাপিয়ে দেওয়ায় নয়, অংশগ্রহণে;সংগঠন টিকে থাকে ভয়ের ওপর নয়, ভালবাসার ওপর।একজন প্রকৃত সংঘপুরুষ সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষকে কাছে টানেন। তিনি জানেন—প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই রয়েছে একেকটি সম্ভাবনা; শুধু সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার প্রয়োজন। মহাথেরো সে কাজে সফল। তিনি তাঁর জীবন চর্যায় হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে আকর্ষণ করে কাছে টেনেছেন। সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন মানবিক সংযোগে, দক্ষ ব্যবস্থাপনায়, এবং আন্তরিক সম্পর্কের বুননে।আলোকিত মানুষের দিশারী :–পূজ্যমহাথেরোর ব্যক্তিত্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর দিশা দেখানোর ক্ষমতা। তিনি মানুষকে শুধু পরামর্শ দেন না; তিনি পথ দেখান। তিনি সমাধান দেন; তিনি আশ্বাস দেন; প্রজ্ঞা দিয়ে মনকে নির্মল করেন, হৃদয়কে সাহস জোগান, চিন্তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ করে দেন।আজকের পৃথিবীতে যেখানে মানুষের দৃষ্টি ক্লান্ত, মন বিপর্যস্ত, পরিবার ভাঙা, সম্পর্ক ক্ষতবিক্ষত—ঠিক সেই সময়ে তাঁর মতো একজন মানুষ আমাদের সমাজে অপরিহার্য দৃষ্টান্ত । তাঁর মানবিকতা সমাজকে শেখায়—দয়া দুর্বলতা নয়;করুণা আত্মসমর্পণ নয়;ক্ষমাশীলতা ভীরুতার পরিচয় নয়;বরং এগুলো শক্তিরই অন্যরূপ।সময়ের সঞ্চিত শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যতের বিশ্বাস :-মহাথেরোর জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়—সমাজ তাঁকে সৃষ্টি করেনি; বরং সময় তাঁকে গড়েছে। তাঁর মূল্য বুঝতে হলে হৃদয়কে বিস্তৃত করতে হয়, দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হয়। তিনি যে পথে চলেছেন—সেই পথ শান্তির, সেই পথ সৃজনের, সেই পথ সদ্ধর্মময়তার দীক্ষায় স্নাত।সমাজ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ তিনি শিখিয়েছেন—”মানুষ মানুষের জন্য”—এটি শুধু বাক্য নয়; এটি একটি কার্যকর নীতি।”সত্য” শুধু নিয়ম নয়; এটি মুক্তির পথ।”সংগঠন” শুধু কাঠামো নয়; এটি মানুষের ঐক্যের শিরায় প্রবাহিত প্রাণশক্তি।আজ যখন তাঁর কর্মের মূল্যায়ন লেখা হচ্ছে স্মারকগ্রন্থের পাতায়, তখন এটি কেবল এক ব্যক্তির প্রশস্তি নয়;এটি এক যুগের মানবিক চেতনার প্রশস্তি,
একটি সমাজের জাগরণের দলিল,একটি সদ্ধর্মপ্রিয় সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী আলোকমন্ত্র।উপসংহার :—-ড. সংঘপ্রিয় মহাথেরো একজন মানুষ নন—তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি চিন্তাধারা, একটি মানবিক আন্দোলন। তিনি সমাজকে দিয়েছেন সৎপথ, দিয়েছেন শান্তির অর্ঘ্য, দিয়েছেন সংগঠনের শক্তি, এবং দিয়েছেন এক নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে চলার সাহস। তিনি প্রমাণ করেছেন—মানুষ যদি সত্যের পথে থাকে,করুণার বাণী ধারণ করে,ভালবাসাকে শক্তি মনে করে,তবে সেই মানুষই পারে সমাজকে বদলে দিতে।এমন গৈরিক সন্যাসী দীপ্ত সংঘপৌরুষকে নিয়ে লেখা বা আলোচনা করা মানে নিজেদের সঠিক পথে চালিত করা; তাঁর কর্মকে মূল্যায়ন করা মানে ভবিষ্যৎকে আলোকিত করা; আর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা মানে শান্তি, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার যাত্রাকে এগিয়ে নেওয়া।
——লেখক:–সরিৎ চৌধুরী ,
প্রকাশক – সংগঠক – সংস্কৃতি কর্মী।
