
মো. কামাল উদ্দিন-
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্নমত, বিরোধী রাজনীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতন, মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার এবং হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু কিছু ঘটনা এমন থাকে, যা শুধুমাত্র একটি মামলার ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি এবং বিচারব্যবস্থার সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। পটিয়ার কাশিয়াইশ ইউনিয়নের বুধপুরা গ্রামের সন্তান, দুবাইপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা মো. কাইছের ঘটনাটি আজ তেমনই একটি আলোচিত অধ্যায়। রাজনীতি করা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। একজন মানুষ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কর্মী হতে পারেন। মত ও পথের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি একজন মানুষ বারবার হয়রানির শিকার হন, যদি তাকে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হয়, যদি তার রাজনৈতিক পরিচয় পর্যন্ত পরিবর্তন করে অন্য পরিচয়ে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এটি কি ন্যায়বিচারের পথ, নাকি প্রতিহিংসার রাজনীতি? কাইছ দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রবাসজীবনের কষ্টার্জিত অর্থের বড় একটি অংশ তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড, নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের সহযোগিতা এবং সামাজিক কাজে ব্যয় করেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। তিনি শুধু রাজনৈতিক কর্মীই ছিলেন না, বরং এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে একজন সহযোগী ও দানশীল ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামা ছিল সাহসিকতার বিষয়। পরাজিত হলেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন। কিন্তু তার সমর্থকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে তিনি ন্যায়সঙ্গত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হন। এরপর শুরু হয় বিরোধ, মামলা এবং সংঘাতের নতুন অধ্যায়। স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমেই আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়। একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল হিসেবেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হন। শুরু হয় দীর্ঘ কারাজীবন। একদিন, একমাস কিংবা একবছর নয়—বছরের পর বছর তিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। এই সময়ে তার পরিবার ভেঙে পড়েছে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সন্তানরা বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যখন তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। পৃথিবীতে একজন সন্তানের জন্য বাবার শেষ মুখ দেখা, জানাজায় অংশ নেওয়া এবং শেষ বিদায় জানানো এক অমূল্য মানবিক অধিকার। কিন্তু সেই সুযোগও তিনি পাননি। কারাগারের দেয়ালের ওপাশে বসে তাকে শুনতে হয়েছে বাবার মৃত্যুর সংবাদ। এই বেদনা কোনো আদালতের নথিতে লেখা থাকে না, কোনো মামলার চার্জশিটে স্থান পায় না, কিন্তু একজন মানুষের হৃদয়ে আজীবন রক্তক্ষরণ ঘটায়। পরবর্তীতে মামলাটি তদন্ত করে পিবিআই। দীর্ঘ অনুসন্ধান, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং তথ্য বিশ্লেষণের পর তদন্তকারী সংস্থা কাইছসহ কয়েকজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করে। এতে অনেকেই আশা করেছিলেন, হয়তো সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। হয়তো একজন নিরপরাধ মানুষ মুক্তি পাবেন। কিন্তু আইনি জটিলতা এবং পরবর্তী প্রক্রিয়ার কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এরই মধ্যে সামনে আসে আরও বিস্ময়কর একটি ঘটনা। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের করা ছাত্র জাহিদুজ্জামান তানভীন হত্যা মামলায় কাইছকে আসামি করা হয়। শুধু তাই নয়, মামলার কাগজপত্রে তাকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ আনা হয়। এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন, যিনি ২০২২ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তিনি কীভাবে ২০২৪ সালে ঢাকার রাস্তায় ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালানোর ঘটনায় অভিযুক্ত হন? পরিবারের দাবি, ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। স্থানীয় বিএনপি নেতারাও একই কথা বলছেন। যদি কারা রেকর্ডে বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এই ঘটনা শুধু একটি মামলার ভুল নয়; এটি তদন্ত ও তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল নীতি হলো—একজন অপরাধী শাস্তি পেলেও একজন নিরপরাধ মানুষ যেন শাস্তির শিকার না হন। বিচারব্যবস্থার সৌন্দর্য এখানেই যে, সত্য উদঘাটনের আগে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু যদি একজন ব্যক্তি কারাগারে থেকেও অন্য জায়গার ঘটনার আসামি হয়ে যান, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি হবে। আজ কাইছের পরিবার শুধু একজন স্বজনের মুক্তি চায় না; তারা চায় সত্যের প্রতিষ্ঠা। তারা চায় নিরপেক্ষ তদন্ত। তারা চায় আদালত ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করুক। পরিবারের সদস্যরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের একজন ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীর বিষয়ে তিনি মানবিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। তারা মনে করেন, কাইছের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি হাজারো রাজনৈতিক কর্মীর ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি, যারা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংঘাতের শিকার হয়েছেন। আজ দেশের মানুষ পরিবর্তনের কথা বলছে। আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের কথা বলছে। সেই বাস্তবতায় কাইছের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ কোনো রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয়; নিরপরাধকে সুরক্ষা দেওয়ার মধ্যেও নিহিত। পরিশেষে বলতে হয়, আদালতের রায়ই একজন মানুষের অপরাধ বা নির্দোষতা নির্ধারণ করবে। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা—সত্য গোপন থাকবে না, রাজনৈতিক পরিচয় বিচারকে প্রভাবিত করবে না, এবং কোনো মানুষ যেন মিথ্যা বা বিতর্কিত অভিযোগের ভারে বছরের পর বছর জীবন হারিয়ে না ফেলেন। কাইছের পরিবার আজও অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন আদালত, তদন্ত সংস্থা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যকে সামনে নিয়ে আসবে। তারা বিশ্বাস করে—সত্যকে হয়তো বিলম্বিত করা যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য চাপা দেওয়া যায় না। ন্যায়বিচারের পথ যত দীর্ঘই হোক, শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হবেই।
জনমনের কথা নিয়ে আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে সরকারের কাছে প্রশ্ন-কারাগারে থেকেও ঢাকার গুলির আসামি! কাইছের মামলা ঘিরে রহস্য ও প্রশ্ন, একজন কাইছের গল্প: রাজনীতি, কারাবাস ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষা, বিএনপি নেতা থেকে ‘স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা’! মামলার নথিতে বদলে গেল পরিচয়, কারাগারের অন্ধকার থেকে আদালতের দরজায়: কাইছের ন্যায়বিচারের লড়াই, সত্য কি একদিন মুক্তি পাবে? পটিয়ার কাইছকে ঘিরে আলোচিত মামলা আর কতকাল চলবে মিথ্যার প্রহসন–????

