সিএমপিতে ওসি রদবদলের হাওয়া: দুই দিনের ব্যবধানে ফের তিন থানায় পরিবর্তন, প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক কৌশল নিয়ে-

0
61

চট্টলচিত্র ডেস্কঃ
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পদে একের পর এক রদবদল এখন নগরজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় আবারও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি পরিবর্তন করা হয়েছে। এর আগে পাঁচটি থানায় বড় ধরনের রদবদল আনার পর নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে মাত্র তিন দিনের মাথায় আবার সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও নজর কেড়েছে পুলিশ প্রশাসন সংশ্লিষ্ট মহল এবং সাধারণ মানুষের। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বুধবার (১৭ জুন) রাতে কোতোয়ালী, কর্ণফুলী ও সদরঘাট থানার ওসি পদে নতুন পরিবর্তন আনা হয়। যদিও আদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সিএমপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। নগরীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোতোয়ালী থানার ওসি মো. আফতাব উদ্দিনকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর স্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর। প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ থানায় নতুন নেতৃত্ব কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কর্ণফুলী থানার ওসি পদে রদবদলের ঘটনা। মাত্র তিন দিন আগে সিটিটিসি থেকে এসে ওসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন কাজী মাসুদ ইবনে আনোয়ার। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে পুনরায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক মো. ইখতিয়ার উদ্দিনকে কর্ণফুলী থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরে এমন দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। ফলে কর্ণফুলী থানাকে ঘিরে বিশেষ কোনো প্রশাসনিক পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সিএমপির কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই আদেশে সদরঘাট থানার ওসি কাজী মো. মাহফুজ হাসান সিদ্দিকীকেও পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর স্থানে এস্টেট শাখার পরিদর্শক মোহাম্মদ শরীফকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা বাণিজ্যিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত কারণে সদরঘাট থানাকে নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থানা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর আগে গত সোমবার (১৫ জুন) সিএমপির পাঁচটি থানায় ব্যাপক রদবদল আনা হয়েছিল। ওই আদেশ অনুযায়ী কর্ণফুলী থানার ওসি মো. শাহীনূর আলমকে ডবলমুরিং থানায়, ডবলমুরিং থানার ওসি জামাল উদ্দিন খানকে সিটিটিসিতে এবং খুলশী থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমানকে একই ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়। সিটিটিসির পরিদর্শক মোজাম্মেল হককে খুলশী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদকে ডিবি দক্ষিণ বিভাগে বদলি করা হয়। চাঁন্দগাঁও থানার ওসি নুর হোসেন মামুনকে চকবাজার থানায় এবং ডিবি দক্ষিণের পরিদর্শক জসিম উদ্দিনকে চাঁন্দগাঁও থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ ধরনের পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। সিএমপি প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও গতিশীল ও কার্যকর রাখা। তবে ঘন ঘন ওসি পরিবর্তনের কারণে মাঠপর্যায়ে কাজের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলছেন অনেকে। একটি থানার সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে ওঠা, স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করা এবং অপরাধচক্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা লাভ করতে একজন কর্মকর্তার কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। সে কারণে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পদায়ন ও প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠছে। অন্যদিকে প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান কমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পর নগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলোতে দক্ষ, চৌকস ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসেবার মান উন্নয়নে এসব রদবদল কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একের পর এক পরিবর্তনের ফলে সিএমপির অভ্যন্তরে যে নতুন এক প্রশাসনিক গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা—দায়িত্বে যেই থাকুন না কেন, অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী তাদের পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here