“চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরীর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণসভা-

0
60

“আমি একজন ইতিহাসভিক্ষুক, আবদুল হক চৌধুরীর মতো ইতিহাসসাধকদের কাছ থেকে ইতিহাস ভিক্ষা করেই ইতিহাসের পথে চলছি”-মো. কামাল উদ্দিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ ও সংস্কৃতির নিবেদিতপ্রাণ গবেষক চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরীর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জীবন, গবেষণা ও ঐতিহাসিক অবদান স্মরণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা বলেন, আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের বিস্মৃত ইতিহাস অনুসন্ধানের একনিষ্ঠ সাধক। তাঁর গবেষণাকর্ম সংরক্ষণ, মূল্যায়ন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় চেরাগী পাহাড়স্থ সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া নিউজ হাউজের কার্যালয়ে ‘ইতিহাসের পাঠশালা’ ও ‘চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের’ উদ্যোগে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন। প্রধান অতিথি ছিলেন লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক মো. কামাল উদ্দিন। তিনি চট্টগ্রাম সিনিয়রস প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব এবং দি ডেইলি টুরিস্টের উপসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংবাদিকতা ও নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশবিদ মাসুদ রানা, মোহাম্মদ শফিকুল আলম সেলিম, গফুর মেম্বার, মোহাম্মদ রাকিব ও মোহাম্মদ সেলিম উল্লাহ।
‘আমি একজন ইতিহাসভিক্ষুক’—প্রধান অতিথি মো. কামাল উদ্দিন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “আমি নিজেকে একজন ইতিহাসভিক্ষুক মনে করি। আবদুল হক চৌধুরীর মতো ইতিহাসসাধকদের কাছ থেকে ইতিহাস ভিক্ষা করেই আমি ইতিহাসের পথে চলছি। তাঁদের গবেষণা, অনুসন্ধান ও জ্ঞানভান্ডার থেকে আমরা অতীতকে জানার আলো পাই। যাঁরা জীবনভর ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করে একটি জনপদের শিকড় ও আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন, তাঁদের কাছে আমাদের শেখার অনেক কিছু রয়েছে।”
তিনি বলেন, আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ অনুসন্ধানী। তিনি বিস্মৃত ইতিহাসের নানা অধ্যায় গবেষণা ও তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামনে এনেছেন। তাঁর গবেষণাকর্ম কেবল অতীতের বিবরণ নয়, বরং চট্টগ্রামের পরিচয়, ঐতিহ্য ও সামাজিক বিবর্তন বোঝার মূল্যবান উপকরণ।
কামাল উদ্দিন আরও বলেন, ইতিহাস কোনো অনুমাননির্ভর বিষয় নয়। প্রকৃত ইতিহাস রচনার জন্য প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ, ঐতিহাসিক দলিল, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও গভীর অধ্যবসায়। অতীতের ঘটনাকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে পারে। তাই ইতিহাসের প্রতিটি তথ্য যাচাই করে সংরক্ষণ এবং গবেষকদের রচনাবলি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, “একজন ইতিহাস গবেষক যখন তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সন্ধান করেন, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য কাজ করেন না; তিনি একটি জাতি ও জনপদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের ভান্ডার তৈরি করেন। আবদুল হক চৌধুরীর মতো গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং তাঁদের গ্রন্থ নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”
চট্টগ্রামের ইতিহাসচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণে গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ঐতিহাসিক গ্রন্থ সংগ্রহ, পুনর্মুদ্রণ, পাঠাগার সমৃদ্ধকরণ এবং নিয়মিত আলোচনা সভার মাধ্যমে চট্টগ্রামের অতীতকে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
‘ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না’—সভাপতি সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন
সভাপতির বক্তব্যে ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন বলেন, “ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা মনে রাখার বিষয় নয়; ইতিহাস হচ্ছে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না। যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, সে জাতি নিজের শিকড়ের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। আবদুল হক চৌধুরীর মতো গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং তাঁদের রচনাবলি সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি বলেন, চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের ইতিহাস অনুসন্ধানের এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। তাঁর গবেষণার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের প্রাচীন জনপদ, সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আঞ্চলিক ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনায় এসেছে। তিনি ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি জনপদের অতীতকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন আরও বলেন, চট্টগ্রামের ইতিহাসচর্চাকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এ জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, সমৃদ্ধ পাঠাগার, ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ এবং তরুণ গবেষকদের উৎসাহিত করা। প্রাচীন পুঁথি, দলিল, স্থানীয় ইতিহাস, লোকজ ঐতিহ্য ও বিস্মৃত ব্যক্তিত্বদের জীবনকর্ম অনুসন্ধান করে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, আবদুল হক চৌধুরীর মতো গবেষকদের রচনাবলি পাঠ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী করে তোলা সম্ভব। ইতিহাসের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করতে পারলে মানুষ নিজের অতীত সম্পর্কে সচেতন হবে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বও উপলব্ধি করবে। ইতিহাসের পাঠশালা ও চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের মতো উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
চট্টগ্রামের ইতিহাসচর্চায় আবদুল হক চৌধুরীর অবদান
আবদুল হক চৌধুরী ১৯২২ সালের ২৪ আগস্ট চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াজিষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ ও নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। চট্টগ্রামের পাশাপাশি সিলেট ও আরাকানের ইতিহাস নিয়েও তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাস গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ, চট্টগ্রামের চরিতাভিধান, চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি, সিলেটের ইতিহাস প্রসঙ্গ, শহর চট্টগ্রামের ইতিকথা, চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা, চট্টগ্রাম-আরাকান, চট্টগ্রামের ইতিহাসবিষয়ক প্রবন্ধ, প্রাচীন আরাকান, রোহিঙ্গা, হিন্দু ও বড়ুয়া, বৌদ্ধ অধিবাসী এবং বন্দর শহর চট্টগ্রাম। তাঁর গবেষণাগ্রন্থগুলো চট্টগ্রামের অতীত, সামাজিক বিবর্তন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর গবেষণার বিশেষত্ব ছিল একটি জনপদের অতীতকে তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা। তিনি ইতিহাসকে শুধু রাজা, শাসক কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক পরিবর্তন, লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নানা দিকও অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর রচনায় চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক পরিচয় নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ইতিহাস সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
আলোচনা সভায় বক্তারা চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রাচীন দলিল, পুঁথি, লোকজ ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের জীবনকর্ম সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বলেন, ইতিহাসের উপাদান হারিয়ে গেলে একটি জনপদের অতীত সম্পর্কে জানার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও হারিয়ে যায়। তাই গবেষণালব্ধ তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, সংরক্ষণ এবং প্রকাশনার মাধ্যমে চট্টগ্রামের ইতিহাসচর্চাকে আরও গতিশীল করা প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, ইতিহাস গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়ন কেবল স্মরণসভা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁদের রচনাবলি সহজলভ্য করা, গবেষণাকর্ম নিয়ে আলোচনা ও পাঠচক্রের আয়োজন করা এবং শিক্ষার্থী ও তরুণদের আঞ্চলিক ইতিহাস অনুসন্ধানে উৎসাহিত করা দরকার। এতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পরিচয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সভায় তাঁর গবেষণাকর্ম সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ইতিহাসচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
বক্তাদের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়, ইতিহাসের শিকড় অনুসন্ধান মানে নিজের পরিচয়কে জানা, আর ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অতীতের মূল্যবান সম্পদ অক্ষুণ্ন রাখা। আবদুল হক চৌধুরীর জীবন ও গবেষণাকর্ম ইতিহাসপ্রেমী মানুষের কাছে সেই দায়িত্ব পালনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here