“গ্রাম সরকার: শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক প্রত্যয়-

0
13

শৈশবের সোনালি স্মৃতি, শহীদ জিয়ার দূরদর্শী দর্শন এবং “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের হাত ধরে তৃণমূলের ক্ষমতায়নের নতুন স্বপ্ন-
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার রাজধানীর সুউচ্চ অট্টালিকায় নয়, তার শক্তি নিহিত থাকে গ্রামের মেঠোপথে, কৃষকের ঘামে, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামে এবং তৃণমূলের মানুষের সম্মিলিত শক্তিতে। যে রাষ্ট্র তার শেকড়কে শক্তিশালী করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। আর সেই শেকড়কে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দেওয়ার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে দেশের ৪১ হাজার ওয়ার্ডে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক কাঠামো পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস নয়; বরং গ্রামীণ জনপদের মানুষের হাতে উন্নয়ন, অংশগ্রহণ, জবাবদিহি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের নতুন সম্ভাবনা তুলে দেওয়ার একটি প্রত্যয়।
মাননীয় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মহোদয় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাম সরকার ব্যবস্থার ইতিহাস, প্রয়োজনীয়তা ও প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে যে তথ্যবহুল ও স্মৃতিময় আলোচনা তুলে ধরেছেন, তা আমাকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। তাঁর সেই বক্তব্য পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, ইতিহাস কখনো হারিয়ে যায় না। সময়ের ধুলোয় কিছু অধ্যায় আড়াল হয়ে থাকলেও মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে একদিন তা আবার ফিরে আসে।
আইনমন্ত্রী মহোদয়ের সেই স্মৃতিচারণ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে আমার শৈশবের দিনগুলোতে। মনে পড়েছে বোয়ালখালীর চরণদ্বীপের কথা, মনে পড়েছে আমাদের পরিবারের একজন অত্যন্ত আপন মানুষ, আমার জেঠাত ভাই মরহুম জানে আলমের কথা। তাঁর স্মৃতি, গ্রাম সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা আজকের এই উদ্যোগকে আমার কাছে আরও আবেগময় ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
শৈশবের স্মৃতিতে গ্রাম সরকার: চরণদ্বীপের জানে আলম
১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে যখন গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, তখন আমি শৈশবের দিনগুলো অতিক্রম করছি। সেই সময় গ্রামীণ সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।
আমাদের বোয়ালখালীর চরণদ্বীপ এলাকায় গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আমার জেঠাত ভাই মরহুম জানে আলম। তিনি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী, বিএনপির একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং সর্বোপরি একজন মানবিক, জনদরদি ও সমাজসচেতন মানুষ।
তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম। মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়া, প্রতিবেশীদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করা, এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং গ্রামের ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখা ছিল তাঁর স্বভাবজাত দায়িত্ববোধের অংশ।
তখনকার গ্রামীণ সমাজে একজন দায়িত্বশীল স্থানীয় নেতৃত্বের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যায় তাঁরা এমন একজন অভিভাবক খুঁজতেন, যাঁর কাছে নির্ভয়ে নিজেদের কথা বলা যায়। জানে আলম ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। দলমত কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কথা শোনা এবং সাধ্যমতো সহযোগিতা করার মধ্যেই তিনি নিজের সামাজিক দায়িত্বের সার্থকতা খুঁজে পেতেন।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলে গেছে গ্রামের পরিবেশ, মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। চরণদ্বীপের সেই দিনগুলো, গ্রাম সরকারকে ঘিরে মানুষের কর্মচাঞ্চল্য এবং জানে আলমের দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা আজও আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
আজ যখন চার দশকেরও বেশি সময় পর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তখন মনে হচ্ছে, ইতিহাস যেন আবার আমাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্যোগের কথা শুনে মরহুম জানে আলমের স্মৃতি নতুন করে হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। মনে হয়েছে, তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই গ্রাম সরকারকে ঘিরে নতুন এই প্রত্যয় দেখে আনন্দিত হতেন।
গ্রাম সরকারের ইতিহাস: শহীদ জিয়ার স্বপ্ন থেকে পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ইতিহাসে গ্রাম সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ।
১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত করা, স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং গ্রাম পর্যায়ে স্বনির্ভরতার পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তাঁর উপলব্ধি ছিল, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে রাজধানী কিংবা বড় শহরের উন্নয়নের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এই দর্শনের ভিত্তিতেই গ্রামীণ সমাজকে সংগঠিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা সমাধানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ব্যবস্থাটি বিভিন্ন পর্যায়ে বাধার সম্মুখীন হয়। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে এর অবসান ঘটে। পরে ১৯৯৭ সালে এবং ২০০৩ সালে গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যবস্থাটিকে আবার আইনি কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
কিন্তু ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে গ্রাম সরকার রহিতকরণ বিল পাসের মধ্য দিয়ে সেই ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামীণ পর্যায়ে স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আর ফিরে আসেনি।
অবশেষে ২০২৬ সালে এসে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন এবং জনসাধারণের মতামত আহ্বানের উদ্যোগ নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক ব্যবস্থাকে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠনের যে প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তা যথাযথ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
গ্রাম সরকার আইন ২০২৬: তৃণমূলের ক্ষমতায়নে নতুন সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু গ্রামীণ বিরোধ মীমাংসা কিংবা ছোটখাটো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। বরং সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক সেবা, কৃষি উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অপরাধ প্রতিরোধসহ বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনের একটি স্থানীয় কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
খসড়া আইনে প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে ১৭ জন সদস্য থাকার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গ্রাম সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংরক্ষিত আসনের নারী ইউপি সদস্যেরও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। পাশাপাশি ১৫ জন সাধারণ সদস্যের অংশগ্রহণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে হ্যাঁ বা না ভোটের বিধান এবং মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতির বিষয়টিও খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম সরকার যেন কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলের প্রভাববলয়ে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং জনগণের মতামত, স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, সেটিই হতে হবে এর মূল দর্শন।
মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার নতুন দিগন্ত
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রাম সরকারের দায়িত্বের পরিধি বেশ বিস্তৃত। বিশেষ করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
1. সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ক্রীড়া কার্ড এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্ড ও সুবিধা বিতরণে সহযোগিতা করার প্রস্তাব রয়েছে। ভিজিএফ ও ভিজিডির মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ ও সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে পারে।
2. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি: কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন, কৃষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ এবং স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গ্রাম সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
3. স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা: নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে জনসচেতনতা তৈরির সুযোগ থাকবে।
4. নারী ও শিশু সুরক্ষা: নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে।
5. মাদক, জুয়া ও অপরাধ প্রতিরোধ: মাদকাসক্তি, জুয়া, সামাজিক অপরাধ এবং জননিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রশাসনকে তথ্য ও সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
6. স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি: গ্রামীণ সমাজে ছোটখাটো বিরোধ ও সামাজিক সমস্যা আইনসম্মতভাবে সমাধানে সহযোগিতা করা গেলে মানুষের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে। তবে কোনোভাবেই প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
অর্থাৎ গ্রাম সরকার কার্যকর হলে গ্রামের মানুষকে প্রতিটি ছোটখাটো প্রয়োজনে উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ের দ্বারস্থ হতে হবে না। স্থানীয় পর্যায়েই অনেক সমস্যার প্রাথমিক সমাধান ও সরকারি সেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান: ইতিহাসের ধারাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার প্রয়াস
একটি আইন প্রণয়ন শুধু কিছু ধারা, উপধারা কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশনার সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, সমাজের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশা।
গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মহোদয়ের ভূমিকা তাই বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থার অতীত ইতিহাস, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
একজন আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব কেবল আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়ের প্রয়োজন, মানুষের প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর আইনগত কাঠামো তৈরি করাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আমার বিবেচনায়, গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র থেকে ক্ষমতা ও দায়িত্বের একটি অংশকে তৃণমূলের মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেলে এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের পরিকল্পনা একটি কার্যকর আইনি কাঠামো লাভ করলে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নতুন ধরনের নাগরিক অংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা, আর্থিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণের ওপর। শুধু আইন পাস করলেই হবে না; আইনটির সুফল যেন গ্রামের সাধারণ মানুষ পান, সেটিই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
গ্রাম সরকার হোক মানুষের সরকার, মানুষের কল্যাণের সরকার
আমি মনে করি, গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে এর মানবিক দর্শন। গ্রামের একজন অসহায় মানুষ যেন তাঁর সমস্যার কথা বলার জন্য একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধিকে কাছে পান। একজন কৃষক যেন তাঁর উৎপাদিত ফসল, সেচ কিংবা কৃষিঋণসংক্রান্ত সমস্যায় সহযোগিতা পান। একজন বিধবা কিংবা অসহায় নারী যেন সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন। একজন শিক্ষার্থী যেন স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলতে পারেন।
গ্রামের মানুষ যেন অনুভব করেন, রাষ্ট্র তাঁদের কাছেও আছে। তাঁদের কথা শোনার জন্য, তাঁদের সমস্যা বোঝার জন্য এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একটি দায়িত্বশীল স্থানীয় কাঠামো রয়েছে।
তবে গ্রাম সরকার যেন কোনোভাবেই ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার কিংবা অনিয়মের নতুন ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। বরং এটি হতে হবে জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
শেষ কথা: স্মৃতির জানে আলম থেকে আগামীর গ্রাম সরকার
জীবনের পথপরিক্রমায় কত মানুষ আসে, কত মানুষ হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের জন্য যাঁরা কাজ করেন, সমাজের কল্যাণে যাঁরা নিজেদের সময় ও শ্রম উৎসর্গ করেন, তাঁরা কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যান না। তাঁদের কর্ম, স্মৃতি ও আদর্শ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
আজ গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বোয়ালখালীর চরণদ্বীপের সেই দিনগুলোতে। মনে পড়ছে আমার জেঠাত ভাই মরহুম জানে আলমের কথা। তাঁর মতো গ্রামবাংলার অসংখ্য সাধারণ মানুষ একসময় স্থানীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও সামাজিক দায়িত্ববোধই ছিল গ্রামীণ সমাজের এক অমূল্য সম্পদ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দর্শন নিয়ে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, সময়ের ব্যবধানে সেই দর্শন নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ইতিহাসের এই পুনরাগমন কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন প্রত্যাশা।
আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মহোদয়ের উদ্যোগে প্রস্তাবিত গ্রাম সরকার আইনটি যথাযথ পর্যালোচনা, জনমত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব আইনে পরিণত হোক। দেশের প্রতিটি গ্রামের মানুষ যেন এর সুফল ভোগ করতে পারেন।
আমার বিশ্বাস, গ্রাম সরকার যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে, তাহলে গ্রামীণ সমাজে উন্নয়ন, সম্প্রীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সুশাসনের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উদ্যোগের পুনর্জাগরণের এই প্রয়াসের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মহোদয়কে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও লাল গোলাপের শুভেচ্ছা।
আর হৃদয়ের গভীর থেকে স্মরণ করছি চরণদ্বীপের মরহুম জানে আলমসহ সেই সব নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে, যাঁরা একসময় গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় নেতৃত্বের মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, তৃণমূল জাগলে রাষ্ট্র জাগবে। গ্রাম সরকার হোক মানুষের অধিকার, মানুষের মর্যাদা এবং মানুষের কল্যাণ প্রতিষ্ঠার নতুন অঙ্গীকার।
— মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও গবেষক
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র্স প্রেস ক্লাব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here