
গভীর রাতে তিন পুলের মাথায় রক্তাক্ত ঘটনা, মামলা হয়নি প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত; শত শত ব্যবসায়ী ও কর্মচারীর ক্ষোভ, পৃথক পৃথক প্রতিবাদ ও নিন্দা, জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্রল চিত্র ও দি ডেইলি টুরিস্ট
চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যিক কেন্দ্র রিয়াজউদ্দিন বাজারে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। গভীর রাতে বাজারের পরিচিত ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলা, মারধর এবং তাঁর কাছ থেকে আনুমানিক ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ী মহল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু বণিক সমিতি নয়, বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী এবং শত শত দোকান মালিক ও কর্মচারী পৃথকভাবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, একজন ব্যবসায়ী যদি নিজ কর্মস্থলের আশপাশেও নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা কোথায়?
রবিবার (১ নভেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে রিয়াজউদ্দিন বাজারসংলগ্ন তিন পুলের মাথায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, একদল ব্যক্তি ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাঁকে মারধর করে আহত করেন। একপর্যায়ে তাঁর কাছে থাকা প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে আহত অবস্থায় তাঁকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী, পরিচিতজন ও কর্মচারীরা চমেক হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে আহত ব্যবসায়ীকে ঘিরে সহকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
অভিযোগের তির কয়েকজনের দিকে, জড়িত আরও ৬–৭ জন!
আহত ব্যবসায়ী জাকির হোসেন হামলার ঘটনায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জসীমউদ্দীন প্রকাশ আরমান (৪৫), সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ সিরাজ (৪০), দিদারুল আলম প্রকাশ কালুদিদার (৫৫) এবং আবু সালেহ আবিদ (৩৫)। এ ছাড়া আরও ৬ থেকে ৭ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি হামলায় অংশ নিয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ।
তবে অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা জরুরি। ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলার পেছনের উদ্দেশ্য এবং অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে, প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে জানা গেছে। একজন ব্যবসায়ীর ওপর হামলা এবং কয়েক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের পরও মামলা না হওয়ায় ব্যবসায়ী মহলে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা প্রদান, অভিযোগ গ্রহণ এবং ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হবে।
বণিক সমিতির তীব্র নিন্দা, বিচার ও গ্রেপ্তারের দাবি
আহত ব্যবসায়ীকে চমেক হাসপাতালে দেখতে গিয়ে রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কাশেম ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, “জাকির হোসেন একজন সৎ ও সহজ-সরল ব্যবসায়ী। তাঁর ওপর এমন হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক সমিতিও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে হামলার সুষ্ঠু বিচার, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং ছিনিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে।
ব্যবসায়ী থেকে কর্মচারী, সবার কণ্ঠে একই প্রতিবাদ
এ ঘটনায় বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক ব্যবসায়ী ব্যক্তিগতভাবে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। শত শত দোকান মালিক, কর্মচারী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
তাঁদের মতে, রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন করেন। রাত পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অনেককে নগদ অর্থ নিয়ে চলাচল করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে একজন ব্যবসায়ীর ওপর হামলা এবং কয়েক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বাজারের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রশ্ন জড়িত।
ব্যবসায়ী সমাজের অনেকেই মনে করছেন, এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু নিন্দা বা প্রতিবাদ নয়, অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা
রিয়াজউদ্দিন বাজার চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ক্রেতা এখানে আসেন। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় গভীর রাতে হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ ব্যবসায়ী সমাজকে নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাজারের প্রবেশপথ, তিন পুলের মাথা এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকারিতা যাচাই, নিয়মিত পুলিশি টহল, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং রাতের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে ঘটনার সময় ও স্থান বিবেচনায় আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে হামলাকারীদের শনাক্তকরণ এবং ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
একটি হামলা, অসংখ্য মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন
জাকির হোসেনের ওপর হামলার ঘটনাটি এখন কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রিয়াজউদ্দিন বাজারের হাজারো ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, আহত জাকির হোসেন রিয়াজউদ্দিন বাজার শ্রমিক দলের সহসভাপতি। তাঁর সাংগঠনিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন নাগরিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
এখন ব্যবসায়ী সমাজের একটাই প্রত্যাশা—ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই, জড়িতদের গ্রেপ্তার, ছিনিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার। একই সঙ্গে রিয়াজউদ্দিন বাজারে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
প্রশ্ন একটাই, রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা কি নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবেন? নাকি অপরাধীদের দৌরাত্ম্যের কাছে প্রতিদিনই তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে? এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

