
মো. কামাল উদ্দিন
বাংলাদেশ পুলিশের বিশাল কর্মপরিসরে কিছু কর্মকর্তা থাকেন, যাঁদের পরিচয় শুধু পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে কর্মদক্ষতা, সাহসিকতা, বিচক্ষণতা, সততা, দায়িত্ববোধ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রাখার মধ্য দিয়ে। তাঁরা দায়িত্বকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেন, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন এবং সহকর্মীদের কাছে হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার উৎস। তেমনই একজন চৌকস, মেধাবী ও দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবির।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু তাঁর পদোন্নতি কিংবা পদায়নের ভিত্তিতে করা যায় না। বরং তিনি কোথায়, কী পরিস্থিতিতে এবং কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেটিই তাঁর পেশাগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবিরের কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায় পর্যালোচনা করলে তাঁর দায়িত্ব পালনের বৈচিত্র্য, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত অগ্রযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়।
চট্টগ্রামের কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। বন্দরনগরী হিসেবে এর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব অপরিসীম। বিপুল জনসংখ্যা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, নগরীর নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সময়ের আইনশৃঙ্খলাজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য সব সময়ই একটি বড় দায়িত্ব।
এমনই এক কঠিন ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. হুমায়ুন কবির। তখন সিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের আরেক নক্ষত্র হাসিব আজিজ। তাঁর নেতৃত্বাধীন পুলিশ প্রশাসনে হুমায়ুন কবির অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপারেশনাল কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অর্থ ও প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বও পালন করেছেন।
একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব শুধু দাপ্তরিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকে না। অপরাধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয়, অপারেশনাল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, অধস্তন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম তদারকি এবং নগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখা তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মহানগরীতে দায়িত্ব পালনের সময় নানা প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি যে প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
আমার দৃষ্টিতে, একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত দক্ষতার প্রকাশ ঘটে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। স্বাভাবিক সময়ে দায়িত্ব পালন আর কঠিন সময়ে দায়িত্বের ভার কাঁধে তুলে নেওয়ার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রামের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা হুমায়ুন কবিরের পেশাগত জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে থাকবে।
২৬ নভেম্বর ২০২৫: ডিআইজি পদে পদোন্নতি, কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন
২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখার উপসচিব মো. মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি লাভ করেন মো. হুমায়ুন কবির।
এই পদোন্নতি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তখন তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে অর্থ ও প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পদোন্নতির পর চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দপ্তর, ধানমন্ডিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং তাঁর দায়িত্বের পরিধি ও পেশাগত প্রত্যাশা বৃদ্ধিরও একটি নতুন অধ্যায়। ডিআইজি পদে উন্নীত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনে নতুন দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
সিএমপি থেকে পিবিআই: নতুন অভিজ্ঞতার অধ্যায়
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা। অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন, তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ, পেশাদার তদন্ত এবং অপরাধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রামের মহানগর পুলিশ প্রশাসনে অপরাধ ও অপারেশনাল কার্যক্রমের দায়িত্ব পালনের পর পিবিআই সদর দপ্তরে কাজ করা তাঁর কর্মজীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তদন্তনির্ভর একটি বিশেষায়িত সংস্থায় দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে অপরাধ অনুসন্ধান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়।
চট্টগ্রামের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং পিবিআইয়ের বিশেষায়িত কার্যক্রম—এই দুই ভিন্ন কর্মপরিবেশ তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
পিবিআই থেকে বর্তমানে SRB-তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
পিবিআইয়ের দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে তিনি SRB-তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দায়িত্ব পালন তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
বিশেষ করে অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশের সঙ্গে তাঁর পেশাগত সমন্বয় ও আন্তরিক কর্মসম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। আহসান হাবিব পলাশের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনকালে হুমায়ুন কবির তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে প্রশাসনিক রদবদলের খবর এসেছে। অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত আইজিপি ফারুকের নতুন দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
আহসান হাবিব পলাশ এবং ফারুক দুজনই পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাঁদের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করি। নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্যেও হুমায়ুন কবিরের মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
কেন হুমায়ুন কবিরের মতো কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ
আমার দৃষ্টিতে, ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবিরের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ ও অপারেশনাল কার্যক্রম, অর্থ ও প্রশাসন বিভাগ, বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পিবিআই এবং বর্তমানে SRB-তে দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতার বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরে।
বাংলাদেশ পুলিশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শুধু দক্ষতা থাকলেই চলে না; প্রয়োজন সততা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা এবং আইনের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা। একজন পুলিশ কর্মকর্তার বড় পরিচয় তাঁর পদমর্যাদা নয়, বরং তাঁর কর্মের স্বচ্ছতা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান।
আমরা প্রায়ই পুলিশের ভাবমূর্তি, শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও জনআস্থা নিয়ে আলোচনা করি। এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব এবং দায়িত্বশীল পেশাদার কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন। অধস্তন সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি মনে করি, হুমায়ুন কবিরের মতো কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের পুলিশ সদস্যদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। একই সঙ্গে হাসিব আজিজ, আহসান হাবিব পলাশ ও ফারুকের মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
পুলিশের মর্যাদা ও মনোবল রক্ষায় প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব
একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে পুলিশকে হতে হবে পেশাদার, নিরপেক্ষ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক। পুলিশের পোশাকের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিটি সদস্যকে সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সাহসিকতা মানে শুধু অভিযান পরিচালনা নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা, নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও প্রকৃত সাহসিকতার পরিচয়।
পুলিশ বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে যোগ্য কর্মকর্তাদের অবদান অত্যন্ত প্রয়োজন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ পুলিশ আরও শক্তিশালী, জনবান্ধব ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
শেষ কথা: পদমর্যাদা নয়, কর্মই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়
একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় পরবর্তী দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। পদমর্যাদা যত বাড়ে, দায়িত্বের পরিধি ও মানুষের প্রত্যাশাও তত বৃদ্ধি পায়।
ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবিরের কর্মজীবনের অগ্রযাত্রা আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক। চট্টগ্রামের কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা, পিবিআইয়ের দায়িত্ব পালন এবং বর্তমানে SRB-তে অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখুক।
আমি বিশ্বাস করি, যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন, তাঁদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা এবং দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ পুলিশের মধ্যে শৃঙ্খলা, সততা ও জনসেবার মানসিকতা আরও সুদৃঢ় হবে।
পদমর্যাদা একজন কর্মকর্তাকে পরিচিতি দেয়, কিন্তু সততা, সাহসিকতা, কর্মনিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই তাঁকে প্রকৃত সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবির মহোদয়ের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ কর্মময় জীবন এবং আগামী দিনের প্রতিটি দায়িত্বে সাফল্য কামনা করছি।
মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক
সাধারণ সম্পাদক
চট্টগ্রাম সিনিয়র্স প্রেস ক্লাব

