বাংলাদেশের রাজনীতির এক অকুতোভয় সিংহপুরুষ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পোদ্যোক্তা ও চট্টগ্রামের অভিভাবকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

0
16

মো. কামাল উদ্দিন
কিছু মানুষের মৃত্যু শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, একটি ইতিহাসের অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, সাহস, দেশপ্রেম, ভালোবাসা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ছিলেন তেমনই একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত সৈনিক, আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতা, প্রথিতযশা শিল্পোদ্যোক্তা, বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এক আস্থার নাম।
তাঁর জীবন ও কর্মের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কয়েকটি অনুচ্ছেদে সম্ভব নয়। আজ তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে আমার হৃদয়ে ভেসে উঠছে তাঁর সঙ্গে কাটানো কিছু স্মৃতি, ১৯৯৫ সালের আন্দোলনের দিনগুলো এবং তাঁর কাছ থেকে পাওয়া এক অসাধারণ ভালোবাসার গল্প।
১৯৮৮ সালে পরিচয়, সম্পর্কের সূচনা
বাবু ভাইয়ের নাম শুনে আসছি ছোটবেলা থেকেই। তবে তাঁর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৮৮ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি গঠন ও আন্দোলনের কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিলেন কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চট্টলবন্ধু এস এম জামাল উদ্দিন সাহেব, যিনি ছিলেন বাবু ভাইয়ের একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
আমার সঙ্গে বাবু ভাইয়ের সম্পর্কটি ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে, একান্ত আন্তরিকতা ও ভালোবাসার। তাঁর জীবনের কঠিন সময়েও আমরা তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।
হুমায়ুন জহির হত্যা মামলায় মিথ্যা অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে তাঁকে যখন দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছিল, তখন তাঁর মনের কষ্ট ও অভিমান প্রায়ই জামাল ভাইয়ের কাছে প্রকাশ করতেন। বিপদের দিনে অনেক পরিচিত মানুষ দূরে সরে গেলেও জামাল ভাই ছিলেন তাঁর পরীক্ষিত বন্ধু।
১৯৯৫ সালের আন্দোলন: বাবু ভাইয়ের পাশে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা
১৯৯৫ সালের ৫ জুন তৎকালীন অস্থায়ী প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্র সংগ্রাম কমিটির সভাপতি হিসেবে আমি ৯ জুলাই অর্ধদিবস হরতালের ঘোষণা দিই। আমাদের দাবির মধ্যে ছিল চট্টগ্রামে পৃথক শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মামলা প্রত্যাহারসহ চট্টগ্রামের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়।
হরতালের পাঁচ দিন আগে শহীদ মিনারে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন সাহেব এবং প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা খোরশেদ ভাই মিছিলসহ অংশগ্রহণ করে কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানান।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটিও আন্দোলন সফল করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করে ব্যাপক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালায়।
বাবু ভাই তখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। জামাল ভাইয়ের টেলিফোনের মাধ্যমে প্রায়ই আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর কণ্ঠে তখন গভীর অভিমান ও বেদনা অনুভব করতাম। তিনি আক্ষেপ করে জানতে চাইতেন, তাঁর জন্য আন্দোলন করার মতো মানুষ কি আর নেই? যাঁদের তিনি রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের অনেকেই আজ দূরে।
সেই কঠিন সময়ে জামাল উদ্দিন, মোসলেম উদ্দিন, কামাল উদ্দিন ও খোরশেদসহ কয়েকজনের ওপর তিনি আস্থা রেখেছিলেন। তাঁর সেই আক্ষেপ আজও আমার মনে পড়ে।
মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে বৈঠক ও হরতালের সিদ্ধান্ত
৮ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে জামাল খানস্থ বিপিসি রেস্ট হাউসে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রী মহোদয় বাবু ভাইয়ের মামলা প্রত্যাহার ছাড়া আমাদের অন্যান্য দাবির প্রতি সমর্থন জানান এবং সেগুলো পূরণের আশ্বাস দেন। কিন্তু বারবার প্রশ্ন করেন, বাবু ভাইয়ের মামলার সঙ্গে চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠার সম্পর্ক কী?
হরতাল প্রত্যাহারের জন্য প্রশাসনিক চাপও সৃষ্টি করা হয়। তৎকালীন উপপুলিশ কমিশনার নজরুল সাহেবসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সক্রিয় ছিলেন। এমনকি আন্দোলনের ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও আমাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
কিন্তু আমি জানতাম, এটি ব্যক্তিগত স্বার্থের আন্দোলন নয়; এটি ছিল ন্যায়বিচার, বিবেক ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের স্বার্থের প্রশ্ন। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা শেষে কৌশলে রেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে এসে সংবাদপত্র অফিসগুলোতে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই।
সেই রাত ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছিল। এমনকি বাবু ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আন্দোলন করছি বলেও অপপ্রচার চালানো হয়েছিল।
কাজীর দেউড়ির বাংলা হোটেলের নিচের নালা দিয়ে পুলিশি তৎপরতা এড়িয়ে আমি, মজহারুল হক শাহ চৌধুরী ও কয়েকজন কর্মী আসকার দিঘীর পাড়ে তৎকালীন গণফোরাম নেতা কামাল আজিজুল হক সাহেবের বাসায় আশ্রয় নিই। পরে ষোলশহরের একটি বাসায় আত্মগোপনে রাত কাটাই।
পরদিন ৯ জুলাই যথানিয়মে হরতাল পালিত হয়। এর আগে লিফলেট বিতরণের সময় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মশাল মিছিল ও হরতাল চলাকালে প্রায় অর্ধশত নেতা-কর্মী এবং মিরসরাইয়ের মিঠাছরা স্কুলের কয়েকজন ছাত্রও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
আমাদের এই আন্দোলনের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ছিল না। ছিল বিবেকের তাগিদ, ন্যায়সংগত দাবি এবং একজন মানুষের বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানবিক দায়িত্ব।
সার্সন রোডের বাসায় বাবু ভাইয়ের সেই অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা
সরকার পরিবর্তনের পর বাবু ভাই দেশে ফিরে আসেন। একদিন এস এম জামাল উদ্দিন ভাইসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ তাঁকে দেখতে সার্সন রোডের বাসায় যাই।
সেদিন তাঁর বাসায় অসংখ্য মানুষের ভিড়। আমি প্রথমে তাঁর কাছাকাছি না গিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্যেও বাবু ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। কাছে ডেকে নিজের পাশে বসালেন। তারপর বুকে টেনে নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে, ভারী কণ্ঠে বললেন,
“কামাল, তুই জীবনে আমার কাছে যেকোনো আবদার নিয়ে আসবি, আমি পূরণ করার চেষ্টা করব। কামাল, তুই আমাকে ঋণী করে ফেলেছিস।”
একজন এত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা ও শিল্পোদ্যোক্তার কাছ থেকে এমন ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ আমাকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছিল। আমি সেদিন নিজের চোখের পানিও ধরে রাখতে পারিনি।
সেখানে জামাল ভাই, মোসলেম উদ্দিন সাহেবসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বাবু ভাইয়ের সেই কথাগুলো আমার হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে আছে, যা কোনো দিন ভুলতে পারব না।
জীবনে বহুবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। অথচ তাঁর কাছে কখনো ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা, অর্থ কিংবা পদ-পদবি চাইনি। শুধু চেয়েছি তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসা। সৌভাগ্যক্রমে সেই ভালোবাসা আমি পেয়েছি।
একজন অভিভাবকের বিদায়, এক অপূরণীয় শূন্যতা
বাবু ভাইয়ের অসুস্থতার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশের অসংখ্য মানুষের মতো আমিও উদ্বিগ্ন ছিলাম। সবার দৃষ্টি ছিল সিঙ্গাপুরের দিকে। সবাই আশা করেছিল, তিনি সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন।
তাঁর চলে যাওয়া শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এক হৃদয়বান অভিভাবক।
আজ জামাল ভাইও নেই, বাবু ভাইও নেই। একে একে জীবনের অনেক প্রিয় মানুষ চলে গেছেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো, তাঁদের ভালোবাসা ও আদর্শ স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে।
বাবু ভাই আমাকে বলেছিলেন, আমি তাঁকে ঋণী করে ফেলেছি। অথচ সত্যি বলতে, তাঁর সেই ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও স্নেহের কাছে আমিই চিরঋণী হয়ে রইলাম।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মহৎ কর্ম ও ভালোবাসা কখনো মৃত্যুবরণ করে না। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, দেশপ্রেমে, রাজনৈতিক অবদানে এবং অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের গভীরে।
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন বাবু ভাইকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
বাবু ভাই, আপনি নেই, কিন্তু আপনার সেই ভালোবাসার স্মৃতি আমার হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকবে। আপনাকে ভুলব না।
মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক, লেখক, প্রাবন্ধিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক
মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here