
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সম্ভাবনার নীরব আলো আছে কিছু মানুষের চোখে, যা কথা বলে না, তবু অনেক কিছু জানিয়ে দেয়। ফারজানা আঁখির চোখও তেমনই—নীরব, সংযত, অথচ গভীর। প্রথম দেখায় ভরা কোনো প্রলেপ নেই, কোনো ভাঁজ নেই ছদ্মবেশের, শুধু একরাশ স্বচ্ছ মনন, যা ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে চায়। এই ছবিতে ধরা পড়া মুখটি ফারজানা আঁখির। তার চোখে কোনো অতিরিক্ত চাওয়া নেই, নেই নিজের অস্তিত্ব প্রদর্শনের ব্যস্ততা; আছে শুধু নিখুঁত মনন এবং ভাবনার স্নিগ্ধ আভা। ফারজানা আঁখি ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শিক্ষার্থী। কুমিল্লা তার শেকড়, কিন্তু তার চিন্তার পরিসর সীমাবদ্ধ নয়। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে জানি না; ফেসবুকের বন্ধুত্বই আমাদের একমাত্র সেতু। তবু অল্প কথাতেই কিছু মানুষ আলাদা হয়ে ওঠে। কথা কম, তবু অর্থপূর্ণ। প্রশ্ন কম, তবু গভীর। তার মধ্যে সেই সচেতনতা, সেই অন্বেষণপ্রবণ মন—যা আজকের সময়ে সবথেকে বড় গুণ।
একদিন সে জানতে চেয়েছিল—“আপনি কি একজন ক্রাইম সাংবাদিক?” প্রশ্নটি সাধারণ হলেও তার ভেতরে ছিল গভীর অনুসন্ধিৎসা। কারণ, সে শুধু দেখতে চায়নি, বুঝতেও চেয়েছে। সে চেয়েছে, কারও কাজের পেছনের অধ্যবসায়, দায়িত্ব এবং সৃষ্টির দিকগুলো দেখতে। সেই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়—ফারজানা শুধু সময় কাটাতে চায়নি; সে শিক্ষিত হওয়ার আগ্রহ, অনুধাবনের চেষ্টা নিয়ে এগিয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম—হ্যাঁ, আমি একজন সাংবাদিক। তবে সেই পরিচয়ই আমার শেষ নয়। আমি একজন লেখক, একজন টেলিভিশন উপস্থাপক। আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে বহুবার, বইয়ের সংখ্যা এখন ত্রিশের ঘরে। কথাগুলো শুনে তার চোখে যে বিস্ময় ফুটেছিল, তা লুকানো ছিল না। বিস্ময়ের সঙ্গে ছিল শ্রদ্ধা, আর শ্রদ্ধার সঙ্গে ছিল কৌতূহল। হয়তো সেই মুহূর্তে তার ভেতরেও জন্ম নিচ্ছিল এক প্রশ্ন—সে নিজে কী হতে পারে, কী হতে চায়।
ফারজানা আঁখির প্রতি আমার ভালো লাগা আসে এখান থেকেই। এটি কোনো ব্যক্তিগত আবেগ নয়, কোনো কল্পনার ছায়া নয়। এটি এক ধরনের আশাবাদ। আজকের মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে—শিক্ষায়, পেশায়, আত্মবিশ্বাসে। তবু লেখালিখির ক্ষেত্র এখনো অনেক সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। মেধাবী মেয়েরা যদি কলমকে বন্ধু করে, যদি নিজের ভাবনা লিখতে শেখে তাহলে সমাজ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাবে, নতুন ভাষা পাবে। ফারজানা আঁখির চোখের স্থিরতা, তার কথার পরিমিতি এসবই এক ভবিষ্যৎ লেখকের ইশারা হতে পারে। সাহসী লেখক হতে গেলে শুধু উচ্চস্বরে কথা বললেই হয় না; দরকার সংবেদনশীল মন, গভীর পাঠ এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই গুণগুলো তৈরি হয় ধীরে ধীরে, নীরবে। আমাদের মতো লেখক ও সাংবাদিকদের দায়িত্বও তাই শুধু লেখা নয়—প্রেরণা দেওয়া, পথ দেখানো, বিশ্বাস জাগানো।
ফারজানা আঁখির মতো শিক্ষার্থীরা যদি লেখার দিকে এগিয়ে আসে, তবে সময় একদিন তাদের কণ্ঠস্বর খুঁজে নেবে। তাদের লেখা সমাজের ভেতর এক নতুন আলো ছড়িয়ে দেবে। একদিন তারা এমন গল্প বলবে, এমন প্রতিবেদন লিখবে, যা আজকের মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। তাদের কলম হবে শুধু কাগজে লিখার হাতিয়ার নয়; হবে সমাজকে বোঝার এবং বদলের শক্তিশালী হাতিয়ার। এই লেখাটি কোনো প্রশংসার ফুলঝুরি নয়। এটি একটি প্রত্যাশার কথা। একটি বিশ্বাসের কথা। যে বিশ্বাস বলে—ফারজানা আঁখির মতো মেয়েরা যদি কলম ধরে, নিজের ভাবনা খুঁজে বের করে, তবে আগামী দিনের সাহসী লেখকদের তালিকায় তাদের নাম স্বতঃসিদ্ধভাবে থাকবে। যখন ফারজানা আঁখির চোখে স্থিরতা দেখি, তার সংযত কথা শুনি, তখন মনে হয়—সম্ভাবনার আলোকে কোনো শব্দের দরকার নেই। নীরবতায় সে নিজের পরিচয় ফুটিয়ে তোলে। যে মেয়েরা আজ নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে শেখে, তাদের ভেতর জন্ম নেয় নতুন সমাজচিন্তা। তাদের লেখা হবে কেবল সাহিত্য নয়; হবে নতুন আলো, নতুন দৃষ্টি, নতুন আশার প্রতীক। ফারজানা আঁখির মতো তরুণী প্রজন্মের প্রতি এই প্রত্যাশা রাখি—নিজের সম্ভাবনা চেন, নিজের গল্প জান, কলমকে বন্ধু কর। ধীরে ধীরে, নীরবে, তবে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চল। কারণ কলমের শব্দে সমাজের চেতনাও জেগে ওঠে। আজ ফারজানা আঁখি আমাদের চোখে অচেনা, অচেনা নয়—সে আমাদের ভাবনার প্রতিফলন, সম্ভাবনার প্রতীক। সম্ভাবনার নীরব আলো সবসময়ই তার নিজের মতো আলোকিত থাকে। ফারজানা আঁখির চোখে সেই আলো ফুটে, যার আভা হয় অনুপ্রেরণার। তার চোখে স্বপ্ন আছে, স্থিরতা আছে, অন্বেষণ আছে। এ ধরনের চোখ সমাজকে জানায়—যে সম্ভাবনা এখনও আছে, যেটি লেখা হয়নি, যেটি বলা হয়নি। এবং সেই সম্ভাবনা একদিন লেখা হবে, বলা হবে, শোনা হবে। ফারজানা আঁখির মতো মেয়েরা যদি কলম ধরে, তাদের কণ্ঠস্বরই হবে আগামী দিনের সাহসী লেখকদের পথপ্রদর্শক।


