
মোহাম্মদ রাকিবঃ
বেলুন উড়িয়ে এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে ১৪ জানুয়ারি বুধবার চট্টগ্রামের জেলা শিল্পকলা একাডেমি হলে রাত নামেনি। বিকাল চারটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সময় যেন থেমেছিল সুরে, শব্দে, আলোয় আর মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা গল্পে। এই গল্পের নাম স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গন একটি সংগঠনের এক যুগ পূর্তি নয়, বরং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জীবনের এক পরিণত অধ্যায়ের উদযাপন। শিল্পকলা একাডেমির সামনে যখন বেলুন উড়ল, তখন তা কেবল আনুষ্ঠানিক সূচনা ছিল না। আকাশে ভেসে উঠল এক যুগের সাধনার প্রতীক। উদ্বোধক আব্দুল মান্নান রানা, স্বরলিপির পরিচালক ও শিল্পীদের সঙ্গে একযোগে বেলুন উড়িয়ে ঘোষণা করলেন সংস্কৃতি এখানে প্রদর্শনী নয়, এটি দায়বদ্ধতার নাম। ভেতরের মিলনায়তনে শুরু হয় গাম্ভীর্যপূর্ণ উদ্বোধনী পর্ব। কোরআন তেলাওয়াত, জাতীয় সংগীত ও এক মিনিট নীরবতায় স্মরণ করা হয় ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে। এরপর থিম সংয়ের ভিজুয়াল পরিবেশনা যেন এক যুগের যাত্রাকে মুহূর্তে চোখের সামনে এনে দাঁড় করায় শৈশব থেকে পরিণতি, স্বপ্ন থেকে সাধনা। স্বরলিপি: শেখানো হয় গান, শেখানো হয় শোনা অনুষ্ঠানের ‘যুগোকথন’ পর্বে উঠে আসে স্বরলিপির দর্শন। এখানে গান শেখানো হয় ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এখানে শেখানো হয় শোনা, অপেক্ষা করা, নিজের জায়গা বোঝা। তাল এখানে শুধু মাত্রা নয় তাল মানে শৃঙ্খলা। সুর এখানে শুধু রাগ নয় সুর মানে অন্যের কণ্ঠকে সম্মান করা। এক যুগ আগে যে পথচলা শুরু হয়েছিল নীরবে, আজ তা পরিণত হয়েছে দৃঢ় অবস্থানে। প্রচারের ঝলক নয়, ধারাবাহিক সাধনাই ছিল স্বরলিপির শক্তি। নেতৃত্ব, উপস্থিতি ও বক্তব্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সংস্কৃতির মৌলিক দায়বদ্ধতার কথা। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমিরুল ইসলাম, উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) জসিম উদ্দীন জনি, নাহার গ্রুপের চেয়ারম্যান রিয়াজ ওয়ায়েজ, বাকার সন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সামশুল হায়দার তুষার। সুশৃঙ্খল ও আধুনিক উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি এগিয়ে নেন সেলিম আকতার পায়েল ও নুসরাত শরমীন সুমি যাদের কণ্ঠে ছিল পরিমিতি, ভঙ্গিতে ছিল সৌন্দর্য। ‘সুরেলা নামি’: স্মৃতির মোড়ক অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ মুহূর্ত আসে ‘সুরেলা নামি’ শীর্ষক স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচনের মাধ্যমে। স্মরণিকাটি স্বরলিপির এক যুগের ইতিহাসকে কাগজে বেঁধে রাখে স্মৃতি, ভাবনা ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার দলিল হিসেবে। সম্মাননা: কৃতজ্ঞতার নীরব ভাষা সম্মাননা পর্বে মঞ্চে ওঠেন নাট্য অভিনেতা মুকিত জাকারিয়া, সঙ্গীত শিল্পী সন্দীপন দাদা, চলচ্চিত্র অভিনেতা পংকজ, লোকশিল্পী মানস পাল চৌধুরী, বৈদ্য সুজন, যন্ত্রশিল্পী মদন মোহন ঘোষ, মরমী ও কাওয়ালি শিল্পী আহম্মদ নুর আমেরী, নাট্য অভিনেত্রী শিপ্রা চৌধুরী। প্রতিটি অনুভূতি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গভীর আত্মপ্রচারের শব্দহীন কৃতজ্ঞতা। মঞ্চে ভবিষ্যৎ নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি, কৌতুক—সবকিছুকে ছাপিয়ে দর্শকের মন কেড়ে নেয় শিক্ষানবিশ ও ক্ষুদে শিল্পীদের পরিবেশনা। তাদের কণ্ঠে ছিল স্বপ্ন, চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস। এই মঞ্চেই স্পষ্ট হয়—স্বরলিপি ভবিষ্যৎ তৈরি করছে। আয়োজক ও শুভানুধ্যায়ীরা উদযাপন পরিষদের আহ্বানে ছিলেন আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আলম, সদস্য সচিব এ আর বাবলু, সমন্বয়ক জাহিদ তানসিরসহ সংগঠনের সক্রিয় সদস্যরা। শুভেচ্ছা জানান সাংবাদিক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, মাহবুবুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান সোহেল, আফসার উদ্দিন অলি, সিআরএস টিভির চেয়ারম্যান সেলিম নুর, চৌধুরী মুহাম্মদ ইকরাম হোসেনসহ অনেকে। বক্তব্যের প্রতিধ্বনি উদ্বোধক আব্দুল মান্নান রানা বলেন—
“স্বরলিপি একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাস। এখানে শিল্প শেখানো হয় মানবিকতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে।” প্রধান অতিথি ওস্তাদ ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম বলেন “সংস্কৃতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা মানুষ গড়ার দায়িত্ব নেয়। স্বরলিপি সেই কাজটিই করছে।” এই এক যুগ পূর্তি কোনো সমাপ্তি নয়। এটি আরও সচেতন হয়ে চলার অঙ্গীকার। আরও দায়িত্বশীল হয়ে সুর ধরার ঘোষণা। স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রমাণ করেছে সংস্কৃতি বিলাস নয়, এটি মানুষের ন্যূনতম আত্মিক প্রয়োজন।


