
পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের নেতৃত্বে স্মরণকালের সফলতম অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ওসি বাবুল আজাদের
চট্টগ্রাম মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত একটি অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, বহদ্দারহাটের চাঞ্চল্যকর এইট মার্ডার মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও পেশাদার কিলার মোঃ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন ওরফে ইমনসহ তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এই অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, এসএমজি, বিপুল পরিমাণ গুলি এবং অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটর সাইকেল। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিচালিত এই অভিযানকে অনেকেই সাম্প্রতিক সময়ের স্মরণকালের অন্যতম সফল পুলিশ অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

সিএমপির সম্মানিত পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ, বিপিএম-এর কৌশলগত নির্দেশনা ও কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্য দিয়ে পরিচালিত এই অভিযানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে অংশগ্রহণ করে। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মহানগরীতে অপরাধ দমনে যে ধারাবাহিক কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে, তারই প্রতিফলন এই সফল অভিযান। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১০ মার্চ ২০২৬ খ্রি. দিবাগত রাতে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস)-এর তত্ত্বাবধানে এবং ডিসি (দক্ষিণ) ও চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ বাবুল আজাদের নেতৃত্বে একটি চৌকস পুলিশ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা কুখ্যাত সন্ত্রাসী আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে চকবাজার থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

এই অভিযানে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদ এবং তার টিমের ভূমিকা। অত্যন্ত দক্ষতা, সাহস এবং পেশাদারিত্বের সাথে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের খোঁজে থাকা একজন বিপজ্জনক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও এই অভিযানের জন্য তাদের প্রশংসা শোনা যাচ্ছে। গ্রেফতারের পর আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চকবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি রিভলভার (থ্রি টু বোর) এবং ৯ রাউন্ড গুলি। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এই অস্ত্র ও গুলি পূর্বে সিএমপির পাহাড়তলী থানা থেকে লুণ্ঠিত হয়েছিল। বিষয়টি পুলিশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী শুধু একজন সাধারণ সন্ত্রাসী নন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বিশেষ করে বহদ্দারহাটে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর এইট মার্ডার মামলায় তিনি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আত্মগোপনে থেকে অপরাধ জগতের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন এবং পর্দার আড়াল থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সমন্বয় করতেন।

গ্রেফতারকৃত কাইয়ুমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিএমপির ডিসি (উত্তর) এবং পাঁচলাইশ থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে আরেকটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। পাঁচলাইশ থানা এলাকায় পরিচালিত ওই অভিযানে গ্রেফতার করা হয় সাজ্জাদ গ্রুপের আরেক সদস্য মনিরকে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস (নাইন এমএম) পিস্তল এবং একটি মোটরসাইকেল। পুলিশ তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে যে উদ্ধারকৃত এই পিস্তলটিও পূর্বে সিএমপির ডবলমুরিং থানা থেকে লুণ্ঠিত হয়েছিল। ফলে এই অভিযানের মাধ্যমে একাধিক লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় পুলিশের তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পরবর্তীতে মনিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভোররাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তার সহযোগী সায়েমকে গ্রেফতার করা হয়। সায়েমের স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে খুলশী থানা এলাকায় লুকিয়ে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় একটি এসএমজি, দুইটি ম্যাগাজিন এবং ৫০ রাউন্ড গুলি। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই অস্ত্র ও গুলি খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। যা প্রমাণ করে যে সন্ত্রাসী চক্রগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ এবং অস্ত্র সরবরাহের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে।


গ্রেফতারকৃত মনির ও সায়েমের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্র আইনে মোট ১০টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং নগরীতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিল। পুলিশ আরও জানিয়েছে, আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর কাছ থেকে সাজ্জাদ গ্রুপের নতুন সদস্য নিয়োগ সংক্রান্ত শপথ গ্রহণের একটি ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করা হয়েছে। এই ভিডিওটি সন্ত্রাসী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং তাদের সংগঠন কাঠামো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামিরা স্বীকার করেছে যে তারা শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নির্দেশে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করত। বিশেষ করে সম্প্রতি চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সংঘটিত গুলিবর্ষণের ঘটনায় আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীই ছিল মূল পরিকল্পনাকারী এবং সমন্বয়কারী। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে যে উদ্ধারকৃত তিনটি অস্ত্র ওই ঘটনার সাথে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। এই সফল অভিযানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরীতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের দৃঢ় নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের সাহসী ভূমিকার কারণে এই অভিযান সফল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদ এবং তার টিমের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতা এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত আসামিদের অন্যান্য সহযোগীদের গ্রেফতার এবং আরও অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, এ ধরনের ধারাবাহিক কঠোর অভিযানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্য নির্মূল করা সম্ভব হবে এবং নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হবে।

অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট এম এন লোকমান শাহ-এর মতামত-এই সফল পুলিশ অভিযানের বিষয়ে অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট এম এন লোকমান শাহ বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিযান পরিচালনা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ও ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বড় সাফল্য। তিনি আরও বলেন, পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ-এর নেতৃত্বে সিএমপির এই দৃঢ় পদক্ষেপ নগরবাসীর মধ্যে আস্থা বাড়াবে এবং সন্ত্রাসীদের জন্য স্পষ্ট বার্তা দেবে যে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদ ও তার টিমের সাহসী ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। অ্যাডভোকেট লোকমান শাহ আশা প্রকাশ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে আসবে। নিচে সাধারণ নাগরিকদের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত মতামত আকারে লেখা দেওয়া হলো—যা সংবাদ প্রতিবেদনে ব্যবহার করা যায়। সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সফল অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপের তিন সহযোগী গ্রেফতার এবং বিপুল অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পুলিশের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
১. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (ব্যবসায়ী, চকবাজার): “পুলিশ যেভাবে ঝুঁকি নিয়ে এই ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এতে আমরা ব্যবসায়ীরা অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছি।”
২. মোঃ আবদুল করিম (দোকানদার, পাঁচলাইশ): “এই সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। পুলিশের এই সফল অভিযান প্রমাণ করেছে যে অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত ধরা পড়বেই।”
৩. রাশেদ মাহমুদ (শিক্ষক, লালখান বাজার): “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পুলিশের এই অভিযান সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।”
৪. হোসনে আরা বেগম (গৃহিণী, চন্দনপুরা): “সন্ত্রাসীদের কারণে আমরা দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছি। পুলিশের এই উদ্যোগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
৫. মোঃ সাইফুল ইসলাম (রিকশাচালক, কোতোয়ালী): “আমরা সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে চাই। পুলিশ যদি এভাবে অভিযান চালায়, তাহলে অপরাধীরা আর মাথা তুলতে পারবে না।”
৬. মোঃ কামাল উদ্দিন (ব্যবসায়ী, বহদ্দারহাট): “যে সন্ত্রাসীরা খুন-চাঁদাবাজির মাধ্যমে শহরকে অশান্ত করেছিল, তাদের গ্রেফতার হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।”
৭. নাসির উদ্দিন (ছাত্র, খুলশী): “পুলিশের এই অভিযান তরুণ সমাজের জন্যও একটি বড় বার্তা—অপরাধের পথ কখনোই নিরাপদ নয়।”
৮. মোঃ শহিদুল ইসলাম (চাকরিজীবী, বায়েজিদ): “কমিশনারের নেতৃত্বে সিএমপি যেভাবে অভিযান চালাচ্ছে, তাতে নগরবাসীর মধ্যে আস্থা তৈরি হচ্ছে।”
৯. নুরুল আমিন (অটোরিকশা চালক, মুরাদপুর): “সন্ত্রাসীদের কারণে আমরা রাস্তায় চলাফেরা করতেও ভয় পেতাম। এখন মনে হচ্ছে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভালো হবে।”
১০. শাহানা আক্তার (শিক্ষার্থী, চকবাজার): “পুলিশের এই সাহসী অভিযান সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আমরা চাই এ ধরনের অভিযান নিয়মিত হোক।” নগরবাসীর প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন দৃঢ় ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবে। সাংবাদিক নেতাদের মতামত চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সাম্প্রতিক সফল অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার এবং বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। সাংবাদিক নেতারাও এই অভিযানের প্রশংসা করেছেন। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন, “চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এই সফল অভিযান নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ও ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং বিপুল অস্ত্র উদ্ধার নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য। পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ সাহেবের নেতৃত্বে সিএমপি যে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশের এমন সাহসী ও দায়িত্বশীল অভিযান অব্যাহত থাকলে নগরীতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আমরা আশা করি।” অন্যদিকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের মূল সভাপতি সালাউদ্দিন রেজা বলেন,“চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এই অভিযান সাম্প্রতিক সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার প্রমাণ করে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ সাহেব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে।” তিনি আরও বলেন, “নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের এই ধরনের ধারাবাহিক অভিযান খুবই প্রয়োজন। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতেও সিএমপি একইভাবে সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অপরাধ দমনে কাজ করে যাবে।”

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার অধ্যায়: বড় সাজ্জাদের উত্থান ও রক্তাক্ত ইতিহাস
চট্টগ্রাম বন্দরনগরী—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার। কিন্তু এই শহরের আরেকটি অন্ধকার ইতিহাসও আছে, যেখানে বন্দুকের নল, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও গ্যাংযুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম কুখ্যাত নাম Sajjad Ali, যাকে সবাই “বড় সাজ্জাদ” নামে চেনে। তার প্রকৃত নাম সাজ্জাদ আলী বা সাজ্জাদ হোসেন খান বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তিনি চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে দ্রুত উত্থান ঘটান এবং অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন শহরের অন্যতম ভয়ংকর সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসী জগতে উত্থান বড় সাজ্জাদের অপরাধ জগতে প্রবেশ ঘটে ছাত্র রাজনীতির সহিংস শাখা থেকে। সে সময় চট্টগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারদের মাধ্যমে সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি হয়। সেই পরিবেশে সাজ্জাদ অস্ত্রধারী ক্যাডার হিসেবে পরিচিতি পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই সে নিজস্ব গ্যাং গড়ে তোলে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। বিশেষ করে— বায়েজিদ পাঁচলাইশ চান্দগাঁও হাটহাজারী পতেঙ্গা এই এলাকাগুলোতে তার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা দখল, অস্ত্র ব্যবসা এবং গ্যাং নিয়ন্ত্রণে জড়িত ছিল। “বাহাদ্দারহাট আট খুন” ঘটনা চট্টগ্রামের অপরাধ ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ২০০০ সালের ১২ জুলাই বাহাদ্দারহাট গণহত্যা। সেই ঘটনায় একসঙ্গে ৮ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ছাত্রলীগের ছয়জন নেতা-কর্মী ছিলেন। এই ঘটনায় বড় সাজ্জাদের নাম জড়িয়ে যায় এবং এক সময় তিনি মামলায় দণ্ডিতও হন। পরে উচ্চ আদালতে তিনি খালাস পান। এই ঘটনার পরই চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার নাম ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে।হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার অভিযোগ বড় সাজ্জাদের বিরুদ্ধে বহু হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে দেখা যায়—১৯৯৯ সালে এক কাউন্সিলর হত্যার ঘটনায় তার নাম উঠে আসে। প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করত তার বাহিনী। তার নির্দেশে একাধিক “কন্ট্রাক্ট কিলিং” সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিদেশে বসেও তিনি ফোন ও অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে লোকজনকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিদেশ থেকে ফোন করে সাজ্জাদ তাকে হুমকি দেয় “তোমার সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নাও।” বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ২০০০ সালের দিকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে একটি AK-47 রাইফেলসহ। কিন্তু পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ২০০৪ সালের দিকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা। এরপর থেকে তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইন্টারপোল রেড নোটিশ রয়েছে। বিদেশে থেকেও তিনি চট্টগ্রামের অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। সাজ্জাদ বাহিনী বড় সাজ্জাদের অধীনে একটি শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
এই বাহিনীর কাজ ছিল চাঁদাবাজি ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ
জমি দখল অস্ত্র মজুত কন্ট্রাক্ট কিলিং পুলিশের ভাষায় এই নেটওয়ার্ক “সাজ্জাদ বাহিনী” নামে পরিচিত। পরে তার সহযোগী Sajjad Hossain (ছোট সাজ্জাদ) চট্টগ্রামে তার হয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকে। গ্যাংযুদ্ধ ও নতুন সংঘর্ষ চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে বড় সাজ্জাদের গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। বিশেষ করে—
সারোয়ার হোসেন আলী আকবর (ঢাকাইয়া আকবর)


এইসব গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। ২০২৫ সালে পতেঙ্গায় গ্যাং সংঘর্ষে ঢাকাইয়া আকবর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান, যার পেছনে সাজ্জাদ গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে— বড় সাজ্জাদ এখনো পলাতক বিদেশে বসে অপরাধ নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বাহিনী এখনো চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় এমনকি ২০২৬ সালেও ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। কতজন মানুষ নিহত হয়েছে? বড় সাজ্জাদের বিরুদ্ধে সরাসরি বা তার বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের নির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারি ভাবে প্রকাশিত হয়নি। তবে বিভিন্ন মামলার তথ্য অনুযায়ী বাহাদ্দারহাটে ৮ জন নিহত গ্যাং সংঘর্ষে একাধিক হত্যা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর ওপর হামলা সব মিলিয়ে তার নাম বহু হত্যা মামলার সঙ্গে জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে উল্লেখ করা হয়। চট্টগ্রামের অপরাধ ইতিহাসে বড় সাজ্জাদ এক অন্ধকার অধ্যায়। ছাত্র রাজনীতির সহিংসতা থেকে শুরু করে শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ—তার উত্থান বাংলাদেশের নগর অপরাধ রাজনীতির এক ভয়ংকর বাস্তবতা তুলে ধরে। অস্ত্র, চাঁদাবাজি, গ্যাংযুদ্ধ এবং হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ তালিকা তাকে পরিণত করেছে চট্টগ্রামের অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত চরিত্রে।ন“চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটি কথাই ঘুরছে—সন্ত্রাসের এই দীর্ঘ রাজত্ব আর সহ্য করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর খুন, চাঁদাবাজি ও গ্যাং দখলের রাজনীতিতে মানুষ ক্লান্ত ও আতঙ্কিত। অনেকের অভিমত, শক্ত হাতে কঠোর অভিযান ছাড়া এই সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য ভাঙা যাবে না। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের নির্মূল করে শহরে শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবিই এখন মানুষের মুখে মুখে।”

