
মো. কামাল উদ্দিন
আমার ছেলেবেলার অনেক কথাই আজ আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। সময়ের স্রোতে কত মানুষ হারিয়ে গেছে, কত ঘরবাড়ি বদলে গেছে, কত পরিচিত মুখ অচেনা হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে গেঁথে থাকে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায় না, বরং আরও গভীর হয়ে ওঠে। আমার ছেলেবেলার সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আমাদের বাড়ির সেই রাতগুলো, মায়ের অসহ্য মাথাব্যথা, ডাকাতির আতঙ্ক, নদী পেরিয়ে মানুষের আশ্রয় নেওয়া এবং স্বাধীনতার পরের অস্থির বাংলাদেশের সেই দিনগুলো।
স্বাধীনতার পরপরই আমাদের বাড়িতে এক রাতে ডাকাত পড়েছিল। তখন আমি খুব ছোট। বয়স এত কম ছিল যে দেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা, যুদ্ধ, অস্ত্র কিংবা অপরাধের ভয়াবহতা বোঝার মতো বয়স আমার হয়নি। কিন্তু ভয় বোঝার বয়স হয়েছিল। মানুষের কান্না বোঝার বয়স হয়েছিল। মায়ের কষ্ট দেখলে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠত, সেটুকু বোঝার বয়স হয়েছিল।
সেই রাতেই আমার মায়ের প্রচণ্ড মাথাব্যথা উঠেছিল।
আমার মায়ের মাথাব্যথা ছিল আমাদের পরিবারের কাছে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো। ব্যথা উঠলে মা আর ঘুমাতে পারতেন না। রাত জেগে সবাইকে মায়ের পাশে থাকতে হতো। কখনো মাথায় পানি দেওয়া হতো, কখনো ওষুধ খাওয়ানো হতো, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু ব্যথা যখন তীব্র হয়ে উঠত, তখন কোনো কিছুতেই যেন মায়ের কষ্ট কমত না।
মায়ের মাথাব্যথার সময় নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়ত। অনেক সময় চোখে ভালোভাবে দেখতে পারতেন না। অসহ্য যন্ত্রণায় মা যখন কাঁদতেন, তখন আমরা ভাইবোনরাও কাঁদতাম। মায়ের সেই কান্না আমাদের ছোট্ট ঘরটাকে যেন আরও ভারী করে তুলত।
আমরা তখন জানতাম না রোগের নাম কী। শুধু শুনতাম, কারও মুখে বলা হচ্ছে মায়ের মাথায় টিউমার হয়েছে। কেউ বলত, মাথার মগজে সমস্যা হয়েছে। কেউ আবার অন্য কোনো রোগের কথা বলত। আমাদের ভয় আরও বেড়ে যেত।
শহরের কত ডাক্তার যে মাকে দেখানো হয়েছিল, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু তখনকার বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক ছিল না। দেশ মাত্র স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকায়নি। চারদিকে অভাব, অনিশ্চয়তা এবং নানা সংকট। উন্নত চিকিৎসার সুযোগও ছিল সীমিত। ফলে মায়ের অসুস্থতা আমাদের পরিবারের জন্য শুধু একটি রোগ ছিল না, ছিল প্রতিদিনের এক নতুন দুশ্চিন্তা।
আমার বাবা তখন সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। আমার বড় তিন বোনও ঘরে। আর আমি ছিলাম একেবারে ছোট। মায়ের মাথাব্যথা উঠলে ঘরের সবাই মাকে ঘিরে বসতাম। কেউ মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, কেউ পানি এনে দিত, কেউ ওষুধ খুঁজত। আর আমি শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
মায়ের কষ্ট দেখে তখন আমার মনে হতো, মা বুঝি আর কোনোদিন ভালো হবেন না।
এই ভয়টা আমার শিশুমনে খুব গভীরভাবে ঢুকে গিয়েছিল।
এর মধ্যেই এক রাতে ডাকাতদের আগমনের শব্দ শোনা গেল।
রাতের নীরবতা হঠাৎ ভেঙে গেল। চারদিকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। ডাকাতরা বুঝতে পেরেছিল, আমাদের এলাকায় তাদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবারের কাছে পরে শুনেছি, তারা সন্দেহ করেছিল আমাদের বাড়ি থেকেই হয়তো ডাকাতির খবর বাইরে চলে গেছে। সেই সন্দেহ থেকেই আমাদের ঘরের দিকে আক্রমণের চেষ্টা করেছিল।
ডাকাতদের কাছে নাকি আগেই খবর ছিল, আমাদের বাড়ির কোনো একটি ঘরে টাকা রাখা আছে।
সেই সময় আমার জেঠাতো ভাই এজলস মিঞা দুবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দুবাই যাওয়ার জন্য তিনি কিছু জায়গা বিক্রি করেছিলেন এবং সেই টাকা ঘরে রেখেছিলেন। ডাকাতরা সেই টাকার সন্ধানেই এসেছিল বলে আমরা পরে জানতে পারি।
কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস।
ডাকাতরা যে ঘরে টাকা রাখা ছিল বলে ধারণা করেছিল, ভুল করে অন্য একটি ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। ফলে তাদের আসল উদ্দেশ্য সফল হয়নি।
কিন্তু তারা যখন প্রত্যাশিত টাকা পেল না, তখন ক্ষোভে পুরো বাড়িতে তাণ্ডব শুরু করল।
আমাদের বাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরেই তারা হামলা চালিয়েছিল। দরজা ভাঙা হয়েছিল। ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করা হয়েছিল। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার মনে আছে, আমাদের পশ্চিম পাশের এজলস মিঞার ঘরটি ছাড়া প্রায় সব ঘরেই ডাকাতরা হামলা চালিয়েছিল।
আজ এত বছর পর সেই রাতের কথা মনে হলে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আমার মায়ের কথা।
বাইরে ডাকাতদের ভয়, আর ঘরের ভেতরে মায়ের অসহ্য মাথাব্যথা।
একজন অসুস্থ মায়ের পাশে বসে থাকা ছোট্ট একটি শিশুর কাছে সেই রাতটি কেমন ছিল, তা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
মায়ের কান্না, চারপাশের মানুষের ছোটাছুটি, দরজা ভাঙার শব্দ, আতঙ্কিত মানুষের ফিসফাস এবং বাইরে অন্ধকার রাতের মধ্যে ডাকাতদের আনাগোনা সবকিছু মিলিয়ে সেই রাতটি আমার শৈশবের এক ভয়ংকর ছবির মতো আজও মনে আছে।
স্বাধীনতার পরের সেই বাংলাদেশ
দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। মানুষের মনে স্বাধীনতার আনন্দ ছিল, কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল যুদ্ধের ক্ষত এবং ভয়াবহ বাস্তবতা।
দেশের সর্বত্র তখন অভাব ছিল। খাদ্যের সংকট ছিল। মানুষের হাতে টাকা ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। চারদিকে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। কোথাও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও পরিবার হারিয়েছে আপনজনকে, কোথাও মানুষ অস্ত্র হাতে ঘুরছে।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনে তখনও শান্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
রাতে ডাকাতির ভয় ছিল। কোথাও কোথাও হত্যা, রাহাজানি এবং বিভিন্ন অপরাধের খবর পাওয়া যেত। মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা ছিল প্রবল।
অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তখন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলত। রক্ষীবাহিনীর নাম আমরা ছোটবেলায় শুনতাম এবং তাদের উপস্থিতি আমাদের মনে এক ধরনের ভয় তৈরি করত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার স্বাধীনতার পর দেশকে অস্ত্রমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণার কথাও তখন মানুষের মুখে মুখে ছিল। কিন্তু সব অস্ত্র যে জমা পড়েনি, সেটিও আমরা বড়দের আলোচনায় শুনতাম।
অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে আমাদের এলাকায়ও নানা ঘটনা ঘটেছে।
আমরা ছোট ছিলাম বলে এসব ঘটনার রাজনৈতিক কিংবা আইনি দিক বুঝতাম না। আমরা শুধু দৃশ্য দেখতাম। কখনো কাউকে ধরে আনা হচ্ছে, কখনো কাউকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে, কখনো গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো দৃশ্য আমাদের ভয় দেখাত, আবার শিশুমনের কৌতূহলও জাগাত।
আজ বয়সের ভারে দাঁড়িয়ে সেই স্মৃতিগুলোকে অন্যভাবে দেখি।
তখন যা দেখে কৌতূহল হতো, আজ তা মনে হলে বিবেক প্রশ্ন করে।
একজন মানুষকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কার?
অপরাধ করলে তার বিচার হবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। আইন আর জনতার ক্রোধও এক জিনিস নয়।
শিশু বয়সে এসব বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, স্বাধীনতার পরের সেই অস্থির সময়টি ছিল আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি অধ্যায়।
মুক্তিযোদ্ধাদের দেখলেই অন্যরকম অনুভূতি হতো
আমাদের এলাকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাদের আমরা আলাদা চোখে দেখতাম।
তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের গভীরতা বোঝার মতো বয়স আমাদের ছিল না। কিন্তু আমরা জানতাম, তারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তারা স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন।
তাই তাদের প্রতি আমাদের এক ধরনের শ্রদ্ধা ছিল।
মুক্তিযোদ্ধারা যখন এলাকায় আসতেন, আমরা দূর থেকে তাদের দেখতাম। তাদের হাতে অস্ত্র থাকত। তাদের চলাফেরায় একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস ছিল। আমাদের কাছে তারা যেন বাস্তব জীবনের নায়ক।
আমরা মনে মনে ভাবতাম, আমরা যদি একটু বড় হতাম, আমরাও মুক্তিযোদ্ধা হতাম।
বাস্তবে আমরা যুদ্ধ করতে পারিনি। কিন্তু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম।
আমাদের খেলার মাঠই ছিল আমাদের যুদ্ধক্ষেত্র। কেউ মুক্তিযোদ্ধা, কেউ শত্রু। বাঁশের কঞ্চি কখনো বন্দুক হয়ে যেত, কাঠের টুকরো হয়ে যেত অস্ত্র। আমরা দল ভাগ করে যুদ্ধ করতাম। কখনো ধাওয়া, কখনো পালানো, কখনো ধরা পড়া। খেলার মধ্যে হাতাহাতি হতো, কখনো মারামারিও হয়ে যেত। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার সবাই বন্ধু হয়ে যেতাম।
শৈশবের সেই খেলাগুলো ছিল আমাদের কাছে আনন্দের, কিন্তু আজ বুঝি, সেগুলোর মধ্যেও আমাদের চারপাশের ইতিহাসের ছায়া ছিল।
রাজাকার ধরার দৃশ্য
স্বাধীনতার পর রাজাকার ধরার ঘটনাও আমরা দেখেছি।
যাদের রাজাকার হিসেবে ধরা হতো, তাদের অনেক সময় অপমানজনকভাবে এলাকায় ঘোরানো হতো। কারও গলায় জুতো পরিয়ে দেওয়া হতো, কারও কোমরে রশি বাঁধা হতো। মানুষ তাদের দেখতে ছুটে আসত।
আমরাও ছোটরা দল বেঁধে পেছনে পেছনে যেতাম।
কখনো হাততালি দিতাম।
তখন আমাদের কাছে বিষয়টি ছিল এক ধরনের দৃশ্য, এক ধরনের উত্তেজনা। আমরা বুঝতাম না মানুষের অপমানের ভেতর কত গভীর ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।
যাদের একসময় এলাকার প্রভাবশালী মানুষ হিসেবে সবাই ভয় করত, তাদেরই একদিন দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেখে আমরা বিস্মিত হতাম।
তখন মনে হতো, এটাই বুঝি ন্যায়বিচার।
আজ বুঝি, ন্যায়বিচারের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিশোধে নয়, ন্যায়সংগত বিচারে।
কর্ণফুলী নদীর তীরে আমাদের বাড়ি
আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল কর্ণফুলী নদী।
নদীটি আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে ছিল যে নদী ছাড়া আমাদের বাড়িকে কল্পনা করা কঠিন।
আমরা ছিলাম কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে। নদীর ওপারে ছিল রাউজানের নোয়াপাড়া। সেই অঞ্চলে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা ছিল অনেক।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নদীটি শুধু নদী ছিল না। নদী হয়ে উঠেছিল মানুষের পালিয়ে যাওয়ার পথ, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথ এবং কখনো কখনো বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
রাত গভীর হলে অনেক মানুষ নদী পার হয়ে আমাদের পাড়ে আসত।
বিশেষ করে হিন্দু পরিবারের অনেক নারী ও তরুণী রাতের অন্ধকারে নদী পার হয়ে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন।
আমাদের ঘরে কত শত মানুষ রাত কাটিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
আজও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য দেখতে পাই।
রাতের অন্ধকার।
নদীর ওপার থেকে নৌকা আসছে।
কেউ ভয়ে চুপ করে আছে।
কেউ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে।
কেউ আবার বারবার পেছনে তাকাচ্ছে।
তারা জানত না পরদিন কী হবে।
তারা শুধু জানত, আজ রাতটা বাঁচতে হবে।
আমাদের বাড়ির দরজা তাদের জন্য খুলে যেত।
আমার মা এবং বাবা নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকলেও অসহায় মানুষকে ফিরিয়ে দিতেন না।
আমাদের চারজন বড় বোন ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মা বাবার মনে ভয় ছিল। বাড়িতে এত অপরিচিত মানুষ, তার মধ্যে হিন্দু পরিবারগুলোর নিয়মিত আসা যাওয়া, আর বাইরে তখনকার অস্থির পরিস্থিতি, সব মিলিয়ে ঝুঁকি কম ছিল না।
তবুও মানুষের বিপদের সময় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।
আজ মনে হয়, সেটাই ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় মানবিক শিক্ষা।
ধর্মের পরিচয়ের ওপরে মানুষের পরিচয়
আমাদের এলাকায় সবাই একই রকম ছিল না।
কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। কেউ ধর্মকে সামনে রাখত। কেউ আবার নানা কারণে পাকিস্তানি পক্ষের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত বলে এলাকায় আলোচনা ছিল।
কিছু মানুষ নাকি গোপনে রাজাকারদের কাছে খবর দিত যে আমাদের এলাকায় হিন্দু পরিবারগুলো আসা যাওয়া করছে এবং কোথায় তারা আশ্রয় নিচ্ছে।
এই খবর যদি সত্যিই বাইরে চলে যায়, তাহলে আমাদের বাড়িও যে বিপদের মধ্যে পড়তে পারত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমার মা বাবার জন্য সেটি ছিল এক কঠিন সময়।
একদিকে নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা।
অন্যদিকে অসুস্থ মা।
তার ওপর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষ।
বাইরে ডাকাতির ভয়।
চারদিকে যুদ্ধের পরের অস্থিরতা।
তারপরও আমাদের বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি।
আজ যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন বুঝতে পারি, আমার মা শুধু একজন মা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসহায় মানুষের আশ্রয়।
আমার বাবা শুধু পরিবারের কর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন কঠিন সময়ের একজন নীরব সাহসী মানুষ।
তাদের কোনো বড় বক্তৃতা ছিল না।
কোনো মঞ্চ ছিল না।
কোনো সংবাদপত্রে তাদের ছবি ছাপা হয়নি।
কিন্তু রাতের অন্ধকারে ভীত মানুষকে নিজের ঘরে জায়গা করে দেওয়া যে কত বড় মানবিক কাজ, সেটি আমি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি।
সেই রাতগুলো আমাকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে
আমার ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ছিল ভয় আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
একদিকে ছিল মায়ের অসহ্য মাথাব্যথা।
অন্যদিকে ছিল ডাকাতির আতঙ্ক।
একদিকে ছিল স্বাধীনতার আনন্দ।
অন্যদিকে ছিল যুদ্ধের পরের অস্থিরতা।
একদিকে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের শিশুমনের শ্রদ্ধা।
অন্যদিকে ছিল মানুষের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য।
একদিকে ছিল রাজাকারদের ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
অন্যদিকে ছিল রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসা অসহায় মানুষের চোখের ভয়।
এই সবকিছুর মধ্যেই আমার শৈশব তৈরি হয়েছে।
আমি তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি, আমার ছেলেবেলার সেই নদী আমাকে মানুষের কষ্ট দেখতে শিখিয়েছে।
মায়ের যন্ত্রণা আমাকে অসহায় মানুষের কান্না বুঝতে শিখিয়েছে।
ডাকাতির রাত আমাকে নিরাপত্তার মূল্য বুঝিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে দেশপ্রেমের প্রথম অনুভূতি পেয়েছি।
আর রাতের অন্ধকারে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু পরিবারগুলোর মুখ আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় নাম মানুষ।
আজও যখন কর্ণফুলী নদীর দিকে তাকাই, আমার মনে হয় নদীটি শুধু পানি বয়ে নিয়ে যায়নি।
সে বয়ে নিয়ে গেছে আমার শৈশব।
সে বয়ে নিয়ে গেছে যুদ্ধের স্মৃতি।
সে বয়ে নিয়ে গেছে মায়ের কান্না।
সে বয়ে নিয়ে গেছে অসংখ্য মানুষের ভয়।
আর সে বয়ে নিয়ে গেছে সেই সময়ের মানুষের ভালোবাসা, সাহস ও মানবিকতার গল্প।
আমার ছেলেবেলার সেই রাতগুলো তাই আজও আমার কাছে শুধু স্মৃতি নয়।
সেগুলো আমার জীবনবোধের প্রথম পাঠ।
সেই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সেই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়।
স্বাধীনতার অর্থ হলো একজন মা যেন সন্তানের সামনে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন।
একজন মানুষ যেন ধর্মের কারণে নিজের ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য না হন।
একজন অসুস্থ মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে কষ্টে কাতরাতে না হয়।
আর কোনো শিশুকে যেন রাতের অন্ধকারে দরজা ভাঙার শব্দ শুনে ভয়ে কাঁপতে না হয়।
আমার ছেলেবেলার সেই দিনগুলো আজও আমাকে প্রশ্ন করে।
আমরা কি সত্যিই সেই ভয়গুলো থেকে মুক্ত হতে পেরেছি?
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে।
দেশ বদলেছে।
শহর বদলেছে।
মানুষের জীবন বদলেছে।
কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা কি বদলেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খুঁজে চলেছি।
হয়তো আমার ছেলেবেলার গল্প শেষ হয়নি।
কারণ নদী এখনও বয়ে যায়।
স্মৃতি এখনও জেগে থাকে।
আর মায়ের সেই কাতর মুখটি আজও আমার হৃদয়ের ভেতর নীরবে বলে যায়, মানুষের কষ্টকে কখনো ছোট করে দেখো না।


