
-বিপ্লব বিজয়ঃ
দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণের দাবিতে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। শনিবার এস রহমান হলে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক নেতারা ন্যূনতম মজুরি ৩৬,০০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তপন দে, শ্রমিক নেতা নাজিম উদ্দিন, ইফতিকার খান, সম জামাল উদ্দিন, ফজলুল কবির মিন্টু, মশিউদ্দৌল্লা এবং কে এন শহীদুল্লা। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তপন দে। বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৮ সালে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি রোয়েদাদ অনুযায়ী জাহাজভাঙা শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ১৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। গ্রিন শিপইয়ার্ডসহ কিছু মালিকপক্ষ দৈনিক ১২ ঘণ্টা শ্রম আদায় করে মাসিক ১৬,০০০ টাকা মজুরি প্রদানের মাধ্যমে আইনকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারকে অবহেলার শামিল।
বিশ্বমানের শিল্প, কিন্তু শ্রমিকের দুরবস্থা বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। এই শিল্পে সরাসরি কাজ করছেন ৮–১০ হাজার শ্রমিক এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষ নির্ভরশীল। জাতীয় জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ০.৫ শতাংশ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের মূল ভিত্তি গড়ে তুলেছেন যেসব শ্রমিক, তাদের মৌলিক জীবনমান এখনও নিশ্চিত হয়নি।ন্যায্য মজুরি: শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক ও সাংবিধানিক দাবি জাহাজভাঙা শিল্পের কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শ্রমিকরা দৈনন্দিন জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেশীয় আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ পুনঃনির্মাণ ও ভাঙার কাজ করে যাচ্ছেন। তাই ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি শ্রমিকদের মৌলিক মানবাধিকার, নৈতিক দায়িত্ব এবং সাংবিধানিক দাবি। বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমান বাস্তবতায় জীবনধারার ব্যয় বিবেচনায় ন্যায্য মজুরি পুনর্নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। ৩৬,০০০ টাকার প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি একটি পাঁচ সদস্যের পরিবার—শ্রমিক নিজে, স্ত্রী, এক–দুই সন্তান এবং পিতা-মাতা বা একজন অভিভাবক—কে মানবিকভাবে জীবনধারণের সুযোগ দেয়। খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, দৈনন্দিন ব্যয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মূল মজুরির অন্তত ১০ শতাংশ সঞ্চয় অপরিহার্য। প্রস্তাবিত ৩৬,০০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি যৌক্তিক এবং অপরিহার্য সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য ৩৬,০০০ টাকার কম মজুরি বাস্তবিক ও মানবিক মানদণ্ডে যথাযথ নয়। এই প্রস্তাব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং শ্রমিক পরিবারের মৌলিক ব্যয়ের যুক্তিসঙ্গত হিসাব। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে শ্রমিকরা আরও নিরাপত্তা ও উদ্যম নিয়ে কাজ করতে পারবেন, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান সংবাদ সম্মেলনের শেষ বক্তব্যে নেতারা সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান যে, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার এবং মানবিক জীবন নিশ্চিত করতে ৩৬,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি দ্রুত নির্ধারণ ও কার্যকর করতে হবে। এছাড়া শ্রম আইন বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই স্তম্ভের ভিত্তি গড়ে তুলেছেন যেসব শ্রমিক, তারা প্রতিদিন জীবনঝুঁকি নিয়ে দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ তৈরি করছেন। তাই তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতারা এক সুরে বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে চাই, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা হোক এবং ৩৬,০০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করা হোক। এটি আমাদের শ্রমিক পরিবারের অধিকার ও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।”


