
মো. কামাল উদ্দিনঃ সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক। জীবনের দীর্ঘ সাংবাদিকতা আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কখনো কখনো কয়েক দশক সময় লাগে, কিন্তু সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি গুজব, একটি অপপ্রচার কিংবা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাই যথেষ্ট। ইতিহাসের প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানকে কোনো না কোনো সময় এই কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বাংলা টিভিও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্ধ সমর্থন করি না। আমার কলম যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছে, তেমনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতেও কখনো দ্বিধা করেনি। সেই নৈতিক অবস্থান থেকেই আজ বাংলা টিভি সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। বাংলা টিভির সঙ্গে আমার সম্পর্ক কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের নয়; এটি কাজের সম্পর্ক, বিশ্বাসের সম্পর্ক এবং দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক। “চট্টগ্রাম সংলাপ”, “কিছু কথা কিছু গান”, “সচিত্র চট্টগ্রাম” সহ একাধিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে গিয়ে আমি এই প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ, নীতি এবং দর্শনকে কাছ থেকে দেখেছি। একজন উপস্থাপক হিসেবে আমি কখনো অনুভব করিনি যে আমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অকারণে সংকুচিত করা হয়েছে। বরং গবেষণাভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবেশ আমি পেয়েছি। এ কারণেই বাংলা টিভির প্রতি আমার একটি স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রথম দিকের আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোর মধ্যে বাংলা টিভি শুধু একটি সম্প্রচারমাধ্যম নয়; এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে একই সূত্রে বেঁধে রাখার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলা টিভিকেও নানা সময়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এসেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, প্রযুক্তির পরিবর্তন এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান এসেছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। এই দীর্ঘ পথচলায় মতবিরোধও এসেছে, বিতর্কও এসেছে। কিন্তু মতবিরোধ আর অপপ্রচার এক জিনিস নয়। আজকের পৃথিবীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একটি ভিত্তিহীন তথ্য কয়েক মিনিটে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে যদি সেই তথ্য মিথ্যা প্রমাণিতও হয়, তবুও ক্ষতির একটি অংশ থেকে যায়। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত, বিচার হওয়া উচিত আইনের মাধ্যমে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিচারালয়ে পরিণত করা কখনোই সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। সামাদুল হক সাহেবকে আমি একজন প্রতিষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে দেখেছি। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় কোনো রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়; সম্পূর্ণ পেশাগত সম্পর্কের ভিত্তিতে। বহুবার তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, একটি গণমাধ্যমকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কতটা ধৈর্য, শ্রম, ত্যাগ এবং দূরদর্শিতার প্রয়োজন হয়। বাংলা টিভির অসংখ্য সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, উপস্থাপক, নির্মাতা, ক্যামেরাপারসন এবং কলাকুশলীর কর্মজীবনের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অনেক তরুণ সাংবাদিকের প্রথম পরিচয় হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অনেক প্রতিভা বিকশিত হয়েছে বাংলা টিভির পর্দায়। একটি প্রতিষ্ঠানের এই অবদানকে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা সাময়িক বিতর্ক দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। আমার নিজের জীবনেও বাংলা টিভির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমি চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, নাগরিক সমস্যা, সামাজিক আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর দেশ-বিদেশের দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। একজন সাংবাদিক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? আমি বিশ্বাস করি, ব্যক্তি বড় নয়—প্রতিষ্ঠান বড়। আর প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বড় হলো তার আদর্শ। সেই আদর্শ যদি সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সাময়িক ঝড় তাকে নাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু ভেঙে দিতে পারে না। আজ যারা কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে নিয়ে মন্তব্য করবেন, তাঁদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান—তথ্য যাচাই করুন, উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনুন, তারপর মতামত দিন। সাংবাদিকতার প্রথম শিক্ষা হলো সত্য অনুসন্ধান; পূর্বধারণা নয়। আমি কারও বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করি না, আবার কাউকে অন্ধভাবে সমর্থনও করি না। কিন্তু যেখানে আমি নিজের অভিজ্ঞতায় একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক অবদান দেখেছি, সেখানে নীরব থাকাও অন্যায় বলে মনে করি। তাই আজ বাংলা টিভির পাশে আমার এই অবস্থান কোনো ব্যক্তি বিশেষকে কেন্দ্র করে নয়; এটি একটি দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, বিবেক এবং পেশাগত দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অপপ্রচার কখনো স্থায়ী হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই আমি বিশ্বাস করি, সত্য, সততা এবং পেশাদারিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা অর্জন করে। বাংলা টিভি সেই আস্থা ধরে রাখুক, আরও সমৃদ্ধ হোক, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশাই একজন সাংবাদিক, একজন উপস্থাপক এবং একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমার।


