
মো.কামাল উদ্দিনঃ
সাংবাদিকতা-পেশার নয়, প্রতিভার কথা
আমি লিখতে বসে যখন নিজেকে পিছনে তাকাই, দেখতে পাই প্রায় তিন যুগ কেটে গেছে। তবু মনে হয়, আমি কিছুই জানি না। সাংবাদিকতার জগৎ—যা অনেকের চোখে শুধু কাগজে কলমের খেলাই—আমার কাছে এক গভীর, রহস্যময়, কখনো সহজভাবে ধরার অযোগ্য সমুদ্র। এই সমুদ্রের ঢেউয়ে আমরা সবাই ভেসে থাকি, কেউ কেউ জলে হারিয়ে যায়, কেউ কেউ আবার আলোর দিশা খুঁজে পায়। গত কয়দিন আগে, “জাগো বাঁশ খালী” নামের অনলাইন চ্যানেলের মেধাবী সাংবাদিক আবু ছিদ্দিক আমার কাছে অনুরোধ করেছিল, আমি লিখি কিছু সত্যি কথা। বিশেষ করে, আমার গবেষণা মূলক বই “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” কে আলোকে সাংবাদিকতার জগৎকে দেখা, যেখানে প্রকাশ হয় অপ্রিয় সত্যি—সত্য যা অনেকেই স্বীকার করতে চায় না। একটি বিষয় আমাকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথিত করে। সম্প্রতি আমি লক্ষ্য করেছি, সাংবাদিকতার কিছু অমর্যাদা ‘অহংকারী’ তাদের দ্বারা গড়ে উঠেছে। এই অহংকার শুধুই নিজের ক্ষমতা বা প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নতুন আগন্তুক মেধাবীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থী, পেশাজীবী বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে দক্ষ মানুষ সাংবাদিকতার দিকে যখন আগ্রহী হয়, তখন তাদের গ্রহণযোগ্যতা বা সুযোগের পথে হঠাৎ অবরোধ তৈরি হয়। যেন সাংবাদিকতা শুধুমাত্র একটি বৃত্তি নয়, বরং তাদের কষ্টার্জিত অধিকার। আমি স্পষ্টভাবে বলছি—সাংবাদিকতা কোনো পেশার বৃত্তই নয়, এটি প্রতিভার যাত্রা। এটি একটি কাঁচি, যা দিয়ে সত্যকে ছিঁড়ে দেখার সাহসিকতা লাগে। এটি একটি বাতাস, যা দিয়ে সমাজের অন্ধকারে আলো পৌঁছাতে হয়। পৃথিবীতে যারা সাংবাদিকতার চূড়ান্ত উৎকর্ষ অর্জন করেছেন, তারা কখনো পেশার সীমাবদ্ধতায় বাঁধা থাকেননি। ওয়াশিংটন পোস্টের বব উডওয়ার্ড, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের ক্যারলিনি ওয়েলার, গার্ডিয়ানের লুসি হিউসন, এরা সবাই তাদের অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। তারা কখনো ‘অন্তরায়’ নিয়ে চিন্তা করেননি। বরং তারা জানতেন, সত্যের অনুসন্ধান কখনো পেশা বা পরিচয়ের খাঁচায় ফিট হবে না। আমি চাই, আমাদের দেশে নতুন আগন্তুকদের জন্যও সাংবাদিকতা এমন একটি মাঠ হয়ে উঠুক যেখানে আগ্রহ, জিজ্ঞাসা, অধ্যবসায়ই নির্ধারণ করবে মান। একজন শিক্ষার্থী, একজন শিক্ষক, একজন ডাক্তার, একজন প্রকৌশলী—যদি তার মনখোলা চোখে সমাজকে দেখা হয়, যদি সে সত্যের প্রতি অবিচল থাকে, তাহলে তার কণ্ঠস্বরও সাংবাদিকতার স্বর হবে। সত্য বলতে গিয়ে অনেকেই ভয় পায়। অহংকারী সাংবাদিকেরা নতুন প্রতিভাকে অগ্রহণযোগ্য বানাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে সেরা সাংবাদিকরা কখনো ভয় পায়নি। তারা জানতেন, সত্য কখনো চুপচাপ থাকবে না। যখন কেউ বাধা দেয়, তখন সৃষ্টিশীলতা, প্রজ্ঞা ও সাহসের জোরে নতুন পথ তৈরি হয়। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, সাংবাদিকতার পেছনে থাকা সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মনন, অধ্যবসায় এবং মানবতার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা। পেশা নয়, এই তিনটি গুণই একজনকে সাংবাদিক বানায়। আর যারা নতুন পথে আসতে চায়—তাদের জন্য দরজা খোলা রাখা আমাদের কর্তব্য। শেষে, আমি এই অনুরোধ জানাই—সাংবাদিকতার জগৎ যেন এক অভ্যন্তরীণ বন্ধন নয়, বরং সকলের জন্য একটি উন্মুক্ত সমুদ্র। প্রতিভা যেখানে এসে মিলিত হয়, সেখানে সত্যের আলো কখনো নিভে যায় না। আমরা চাই নতুন প্রজন্মও এই আলোতে ভেসে উঠুক, যেন সমাজ, দেশ এবং মানুষ সবসময় সত্যের স্বরে জাগ্রত থাকে। সত্যিকার সাংবাদিকতা কখনো পেশার বন্দী হয় না; এটি বাঁচে কেবল সাহসী মন, উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক দায়বদ্ধতায়। তাতে আমি আজকের এই লেখা লিখতে বসলাম – সাংবাদিকতা হলো একটি পেশা নয়—এটি হলো সত্য প্রকাশের এক মহৎ দায়। এটি কোনো জন্মগত অধিকার নয়, এবং formal degree থাকা বা না থাকার মাধ্যমে কেউ সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতা হারায় না। বিশ্বে অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা ট্যাক্সি চালক, হকার, দোকানদার, নাবিক বা ছোট চাকুরিজীবী থেকে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেছেন। তাদের জীবন প্রমাণ করে, দক্ষতা, সততা, সাহস এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে উঠতে পারে। প্রথাগত ধারণা হলো, সাংবাদিক হতে হলে পত্রিকায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, বা formal degree থাকা আবশ্যক। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিজ্ঞতা, সাহস এবং সমাজের বাস্তব চিত্র বোঝার ক্ষমতা সাংবাদিককে খ্যাতি এনে দিতে পারে। ইতিহাসে কিছু নজির- পিয়েরে মামবেলে: ট্যাক্সি চালক থেকে সাংবাদিকের সহযোদ্ধা-ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর পিয়েরে মামবেলে ছিলেন সাধারণ ট্যাক্সি চালক। ১৯৭০ এবং ১৯৯০ দশকে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে সাহায্য করেছিলেন। তার formal degree বা প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ ছিল না। তবু তার দক্ষতা, সাহস এবং পথ-জ্ঞান তাকে সাংবাদিকদের জন্য অপরিহার্য করে তুলেছিল। হার্বার্ট হজ: ট্যাক্সি চালক থেকে BBC রেডিও ব্যক্তিত্ব যুক্তরাজ্যের হার্বার্ট হজ ছিলেন লন্ডনের ট্যাক্সি চালক। তার জীবন অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাকে রেডিও সাংবাদিকতায় পরিচিতি এনে দেয়। তিনি তার গল্প এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শক ও শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন। হান্টার সি. থম্পসন: ছোট চাকরি থেকে Gonzo journalism মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হান্টার সি. থম্পসন ছোট ছোট চাকরি থেকে উঠে এসে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। তিনি “Gonzo Journalism” ধারণার স্রষ্টা, যেখানে লেখক নিজের অভিজ্ঞতা এবং সরাসরি ঘটনাস্থল থেকে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তার কাজ প্রমাণ করে, formal training ছাড়া সাহস, দক্ষতা ও স্বতন্ত্র স্টাইলই সাংবাদিকতার মূল শক্তি। আলেক্সি হ্যালি: নাবিক থেকে Pulitzer Prize বিজয়ী সাংবাদিক মার্কিন সাংবাদিক আলেক্সি হ্যালি নাবিক এবং ক্রীড়া কর্মী থেকে উঠে এসেছেন। তিনি “Roots” বইয়ের মাধ্যমে Pulitzer Prize জিতেছেন। তার জীবন প্রমাণ করে, সাধারণ পেশার অভিজ্ঞতা সাংবাদিকতার সবচেয়ে মূল্যবান ভিত্তি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি এবং স্বীকৃতি আজকের দিনে, কিছু তথাকথিত সাংবাদিক অন্য পেশা থেকে সাংবাদিক হয়ে ওঠা মানুষদের স্বীকৃতি দেয় না। তারা বলেন, “সাংবাদিক হতে হলে formal degree থাকতে হবে।” “অন্য পেশার মানুষ সাংবাদিক হতে পারে না।” কিন্তু সত্যি কথা হলো, সাংবাদিকতা মানে কাগজের শংসাপত্র নয়। এটি হলো তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং জনগণের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়া। যদি একজন ট্যাক্সি চালক, হকার বা দোকানদার এই কাজ করতে পারে, তার যোগ্যতা formal degree-ও থাকা সাংবাদিককে ছাড়িয়ে যেতে পারে। অহংকার ও সামাজিক মনোভাব এখানে মূল প্রতিবন্ধকতা হলো অহংকার। অনেক established সাংবাদিক মনে করেন, শুধু তারা যোগ্য। তারা স্বীকার করতে চায় না যে, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব জীবনও সাংবাদিককে দক্ষ করে তোলে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, যে কেউ যদি সততা, সাহস, মেধা এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করে, তার কাজ সমাজের চোখে নিজেই স্বীকৃত। অন্য পেশার অভিজ্ঞতা সাংবাদিককে বাস্তবধর্মী করে তোলে। তারা শুধু খবর দেয় না, তারা জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যা formal training করা অনেক সাংবাদিকও করতে পারেন না। শিক্ষণীয় দিক সাংবাদিকতা হলো দায়িত্ব, পেশা নয়। এটি যে কেউ করতে পারে, যদি তার মধ্যে সত্য প্রকাশের আগ্রহ থাকে। অন্য পেশার অভিজ্ঞতা মূল্যবান। ট্যাক্সি চালকের রাস্তার গল্প, হকারের প্রযুক্তি, দোকানদারের জনসংযোগ—সবই সাংবাদিককে সমৃদ্ধ করে। মেধা ও সততা সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। Formal degree থাকলেও যদি মেধা না থাকে, সাংবাদিকতা শূন্য। সাধারণ পেশার মানুষ যদি দক্ষ ও সততার পরিচয় দেয়, সে প্রকৃত সাংবাদিক। স্বীকৃতি আসে কাজের মান থেকে। অহংকার ও rigid ধারণা বাধা সৃষ্টি করে। যারা সত্যি দক্ষ, তার কাজ সমাজের চোখে নিজেই স্বীকৃত। সাংবাদিকতা কখনো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হলো সাহস, সততা, অধ্যবসায় এবং সত্য প্রকাশের শিল্প, যা যে কেউ করতে পারে। যারা অন্যান্য পেশার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করছেন, তারা প্রমাণ করছেন যে সত্য প্রকাশের আগ্রহ এবং দক্ষতা থাকলেই কেউ বিশ্বমানের সাংবাদিক হতে পারে। ইতিহাস, অভিজ্ঞতা এবং সাহসিকতার উদাহরণ আমাদের শেখায়, সাংবাদিকতার মহত্ত্ব, পেশার মর্যাদা নয়, সত্য প্রকাশের তীক্ষ্ণতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় নিহিত।


