শিরোনাম
ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ, বাতিল ১০৩ অনাপত্তি সনদরাষ্ট্রীয় পুলিশ পদকের স্বীকৃতি পাচ্ছেন বাবুল আজাদ কঠিন সময়ে পাহাড়তলী থেকে ডবলমুরিং, চকবাজার হয়ে ডিবিতে; সাহস, মেধা ও পেশাদারিত্বে উজ্জ্বল এক পুলিশ কর্মকর্তার পথচলা-জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রীসতীশ বাবু লেইনের ভাইরাল ছিনতাই: মূলহোতা সাদ্দাম গ্রেফতারআন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মানবিক পুলিশিংয়ের নতুন দিগন্ত আইসিআরসি ও এপিবিএনের যৌথ প্রশিক্ষণ: আইন প্রয়োগে মানবাধিকার, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতায় হাসিব আজিজের নেতৃত্বে নতুন ভাবনাআমার ছেলেবেলা ৬ সেই রাতগুলো আজও মনে পড়েএপিবিএন: ইতিহাসের অগ্রযাত্রায় জিয়াউর রহমান থেকে আজিজুল হক, আজিজুল হক থেকে হাসিব আজিজ একটি বাহিনীর জন্ম, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভাবনার বিবর্তন, দুই প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং জননিরাপত্তার নতুন অঙ্গীকারবৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহানগর কমিটির প্রথম সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত কালুরঘাট সেতু নির্মাণ, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনসহ ১০ দফা নাগরিক ইস্যুতে কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্তচট্টগ্রাম মেডিকেলে ইউনিট-২ চালুসহ ডেঙ্গু চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি পরিচালকের সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মতবিনিময় রোগী হয়রানি ও দালালচক্র বন্ধ, জনবল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সচলের ওপর জোরযেসব কারণে বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

― Advertisement ―

স্মৃতির সাইকেলে ফিরে দেখা: চরণদ্বীপের মেঠোপথ, কর্ণফুলীর বাতাস আর হারিয়ে যাওয়া এক স্বর্ণালি শৈশব

Homeসম্পাদকীয়স্মৃতির সাইকেলে ফিরে দেখা: চরণদ্বীপের মেঠোপথ, কর্ণফুলীর বাতাস আর হারিয়ে যাওয়া এক...

 — মো. কামাল উদ্দিন 
কিছু ছবি সময়কে থামিয়ে রাখে। কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। এই ছবিটির দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয়—আমি যেন ফিরে গেছি বহু বছরের পেছনে, আমার প্রাণের গ্রাম চরণদ্বীপে। সেই কিশোরটি আজও বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ চারপাশের পৃথিবী কত বদলে গেছে! সেই সাইকেলটি ছিল না কেবল দুটি চাকার একটি বাহন; সেটিই ছিল আমার কৈশোরের ডানা, স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ, সাহসের প্রথম পাঠ এবং জীবনকে চিনে নেওয়ার প্রথম সহযাত্রী। তার চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছে আমার শৈশব, আমার স্বপ্ন, আমার সীমাহীন আনন্দ। আমাদের ঐতিহ্যবাহী চরণদ্বীপের নজর মোহাম্মদ বাড়ি ছিল আমার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। সেই বাড়ির উঠোনে বেড়ে উঠেছি, শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখেছি, পাখির ডাক শুনে ভোরের আলোকে স্বাগত জানিয়েছি। সেই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি উঠোন আজও আমার কাছে ইতিহাসের মতোই মূল্যবান। সেখানে শুধু আমার পরিবার নয়, আমার শিকড়, আমার পরিচয় এবং আমার অস্তিত্বের গভীরতম অনুভূতি লুকিয়ে আছে। ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজ ধানক্ষেত, কাশবনের দোল, তাল-খেজুরের সারি আর দূরে নীল আকাশের নিচে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদী—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই এক মহাকাব্য রচনা করেছিল। কর্ণফুলীর বুক থেকে ভেসে আসা বাতাস আমাদের মুখে এসে লাগত, আর মনে হতো পৃথিবীতে এর চেয়ে নির্মল সুখ আর কিছু নেই।
সেই সাইকেলেই কতবার যে বোয়ালখালীর পথে ছুটে গেছি! কখনো বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে হাসতে, কখনো নিঃসঙ্গ দুপুরে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। আর কালুরঘাট সেতু—সে তো ছিল আমাদের কিশোর বয়সের বিস্ময়। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নিচে প্রবাহমান কর্ণফুলীর দিকে তাকিয়ে মনে হতো, নদী শুধু জল বহন করে না, মানুষের ইতিহাস, ভালোবাসা আর সময়ের গল্পও বহন করে নিয়ে চলে। আজও স্পষ্ট মনে আছে, একদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—সাইকেল চালিয়ে আনোয়ারার হযরত মোহসীন আউলিয়ার মাজারে যাব। সেই দীর্ঘ পথযাত্রা ছিল আমাদের জীবনের এক অনন্য অভিযান। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু ক্লান্তির চেয়ে আনন্দ ছিল অনেক বড়। পথের ধুলো আমাদের পোশাকে লেগেছিল, কিন্তু হৃদয়ে লেগেছিল অমলিন স্মৃতির রং। সেই সফর আমাদের শিখিয়েছিল—বন্ধুত্ব মানে একসঙ্গে পথ চলা, আর জীবন মানে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
পরে শহরের ব্যস্ত রাস্তায়ও বহু বছর সাইকেল চালিয়েছি। জীবনের প্রয়োজন মিটেছে, কর্মের গতি বেড়েছে; কিন্তু শহরের কংক্রিটের পথে কখনো খুঁজে পাইনি চরণদ্বীপের মাটির গন্ধ, কর্ণফুলীর বাতাসের স্পর্শ কিংবা কালুরঘাট সেতুর বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে অনুভব করা সেই অনির্বচনীয় স্বাধীনতা।
আজকের শিশুরা পৃথিবীকে চেনে মোবাইলের পর্দায়, আর আমরা চিনেছিলাম সাইকেলের চাকায় ভর করে। আমাদের মানচিত্র ছিল গ্রামের পথ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রকৃতি, আমাদের শিক্ষক ছিল নদী, মাঠ, আকাশ আর মানুষের জীবন। সময় অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। অনেক মুখ হারিয়ে গেছে, অনেক পথ বদলে গেছে, অনেক স্মৃতি ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে আজও অমলিন হয়ে আছে সেই পুরোনো সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি। মনে হয়, যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম সেই চরণদ্বীপে, সেই নজর মোহাম্মদ বাড়ির উঠোনে, সেই কর্ণফুলীর পাড়ে, সেই কালুরঘাট সেতুর ওপর, তবে হয়তো আবারও শুনতে পেতাম কৈশোরের হাসি, অনুভব করতাম জীবনের সবচেয়ে নির্মল আনন্দ।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পদ থাকে, যার মূল্য কোনো অর্থে মাপা যায় না। আমার কাছে সেই অমূল্য সম্পদ হলো—একটি পুরোনো সাইকেল, একটি নদী, একটি গ্রাম, একটি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি এবং স্মৃতির আলোয় চিরসবুজ হয়ে থাকা এক স্বর্ণালি শৈশব। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই স্মৃতিগুলোই আমার হৃদয়ের আকাশে জ্বলতে থাকবে ধ্রুবতারার মতো।