
মো.কামাল উদ্দিনঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবেগময় লেখা উপস্থাপন করছি–
-রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে, যাদের প্রাপ্য সম্মান সময়মতো না পাওয়ার দায় কেবল ব্যক্তির নয়—প্রতিষ্ঠানেরও। পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ তেমনই এক কর্মকর্তা, যিনি দীর্ঘ পেশাগত জীবনে নিষ্ঠা, সততা ও ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বহু বছর পদোন্নতিতে উপেক্ষিত থেকেছেন। তাঁর এই অবহেলার পেছনে প্রশাসনিক বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল—এমন ধারণা বহু মহলে উচ্চারিত হয়েছে। একজন কর্মকর্তা তাঁর কর্মদক্ষতা দিয়ে নয়, বরং পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়ায় মূল্যায়িত হলে—সেখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জাগে। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেও যথাসময়ে স্বীকৃতি না পাওয়া কেবল ব্যক্তিগত বঞ্চনা নয়; এটি পুরো বাহিনীর মনোবলেও প্রভাব ফেলে। আজ সময় এসেছে বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ার। রাষ্ট্র যদি যোগ্যতা, সততা ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে মর্যাদা দিতে চায়, তবে অবহেলিতদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ফিরিয়ে দেওয়াই হবে ন্যায় ও প্রজ্ঞার পরিচয়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন, যাদের কর্মজীবন কেবল পদ-পদবি দিয়ে মাপা যায় না। তাঁদের জীবনের ভেতর লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অবদমন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের চাপ, নীরব সংগ্রাম এবং অবশেষে পরীক্ষিত নেতৃত্বের স্বাক্ষর। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ সেই বিরল ধারার একজন কর্মকর্তা—যার জীবনের গল্প কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতা ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর। বিজয়ের উচ্ছ্বাস তখনো বাংলাদেশের আকাশে। সেই সময় জন্মগ্রহণ করেন হাসিব আজিজ। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম প্রজন্মের সন্তান হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল এক বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। তাঁর পিতা, মরহুম এম আজিজুল হক, ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। পেশাগত সততা, দৃঢ়তা ও নীতিনিষ্ঠার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর সময় তিনি দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে বিশেষ আস্থা অর্জন করেন। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং শেষ পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত সময়ে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনীত এবং আস্হাবাজন হিসেবে ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদেও তিনি দায়িত্ব পান।
এই পেশাগত ঐতিহ্য ছিল একদিকে গৌরবের, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক কঠিন মানদণ্ড। ১৯৯৫ সালে ১৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে হাসিব আজিজ বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি ছিলেন কর্মঠ, নীতিনিষ্ঠ ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কর্মকর্তা। পুলিশ বাহিনীতে তাঁর পরিচিতি ছিল—নীরব কিন্তু দৃঢ়। প্রচারের আলো এড়িয়ে, কাজের ভেতর দিয়ে পরিচিতি অর্জনই ছিল তাঁর পথ। প্রশাসনিক কাঠামোতে পদোন্নতি কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়—এটি স্বীকৃতি, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রস্তুতির প্রতীক। কিন্তু হাসিব আজিজের কর্মজীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে অপেক্ষায়। দীর্ঘ সময় তিনি অতিরিক্ত ডিআইজি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর অনেক জুনিয়র কর্মকর্তা পরবর্তীতে ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার কিংবা আরও উচ্চপদে উন্নীত হয়েছেন। এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নীরব আলোচনা ছিল। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে যে ধারণা বা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা তাঁর পেশাগত অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। যদিও এসব বিষয় কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়নি, তবুও দীর্ঘ সময় পদোন্নতি না পাওয়া একটি বাস্তব ঘটনা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয়—তিনি কখনো হতাশ হয়ে সরে দাঁড়াননি। দীর্ঘ সময় তাঁকে সিআইডি সহ এমন কিছু দায়িত্বে রাখা হয়, যেগুলো আলোচিত নয়, কিন্তু প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে থেকেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন কর্মকর্তা যখন আলো থেকে দূরে থাকেন, তখন তাঁর প্রকৃত পেশাদারিত্বই পরীক্ষিত হয়। বাহিনীর ভেতরে তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা গড়ে ওঠে তা হলো—তিনি স্থির, প্রজ্ঞাবান এবং দায়িত্বে আপসহীন। আমি তাঁকে চট্টগ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকা সময় থেকে চিনি —এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষায় নয় তবে একজন কর্মকর্তাকে কাছ থেকে দেখা মানে তাঁর মানবিক দিক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং সংকটময় সময়ে অবস্থান—এসবের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছি। আমার অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন—
বিনয়ী, দায়িত্বশীল, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার চেষ্টা করা, বাহিনীর সদস্যদের প্রতি মানবিক। এই মানবিক নেতৃত্ব পরবর্তীতে তাঁর প্রশাসনিক দর্শনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী। এখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি মানে জাতীয় অর্থনীতির সুরক্ষা। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তিনটি দিককে অগ্রাধিকার দেন— ১. বাহিনীর মনোবল: পুনর্গঠন দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ক্লান্তি কাটিয়ে তিনি সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক, সরাসরি যোগাযোগ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। ২. জনআস্থা পুনঃস্থাপন: থানা পর্যায়ে জনবান্ধব আচরণ, অভিযোগ গ্রহণে স্বচ্ছতা, এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া—এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে। ৩. অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কঠোরতা: অপরাধী যেই হোক—প্রভাবশালী বা সাধারণ—আইনের আওতায় আনার নীতি গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সবসময়ই একটি বাস্তবতা। কিন্তু পেশাদার কর্মকর্তা সেই বাস্তবতার ভেতর থেকেও নিরপেক্ষতা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। হাসিব আজিজের দীর্ঘ কর্মজীবন দেখলে বোঝা যায়—তিনি ধৈর্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দীর্ঘ সময় পদোন্নতি না পাওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল—রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যোগ্যতার মূল্যায়ন করবে। এই ধৈর্যই তাঁকে আজ আরও পরিণত করেছে। তিনি জনসমক্ষে উচ্চকণ্ঠ নন। বরং সিদ্ধান্ত নেন নীরবে, বাস্তবায়ন করেন কার্যকরভাবে। বাহিনীর সদস্যরা বলেন—তিনি নির্দেশ দেন যুক্তি দিয়ে, চাপ দিয়ে নয়। এ ধরনের নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়। আইজিপি হওয়ার প্রশ্ন: ব্যক্তি নয়, প্রক্রিয়ার স্বীকৃতি। বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে যিনি বসবেন, তাঁকে হতে হবে— মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞ, প্রশাসনিকভাবে দক্ষ, রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলায় সক্ষম, জনআস্থার প্রতীক, এই মানদণ্ডে হাসিব আজিজের কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তিনি প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিজেকে পরীক্ষিত করেছেন।
রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠানের ন্যায়বিচারে। যদি যোগ্য কর্মকর্তারা সময়মতো স্বীকৃতি পান, তবে পুরো বাহিনী উৎসাহিত হয়। অন্যথায় হতাশা জন্ম নেয়। হাসিব আজিজের কর্মজীবন সেই বৃহত্তর প্রশ্ন তোলে—পদোন্নতির প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, কতটা ন্যায়সংগত? ধৈর্যের জয় হোক হাসিব আজিজের জীবনগাথা একটি প্রতীক—ধৈর্যের, পেশাদারিত্বের, নীরব সংগ্রামের। তিনি দেখিয়েছেন প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করা যায়, আস্থা পুনর্গঠন করা যায়।
রাষ্ট্র যখন তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে, তখন এমন পরীক্ষিত কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা ও সততা অবশ্যই বিবেচনায় আসা উচিত। ব্যক্তি নয়—যোগ্যতা, নীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থই হোক চূড়ান্ত মানদণ্ড।


