
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
রেশমি—একটি নাম, কিন্তু এখন তা আর শুধু নাম নয়; যেন ভাঙা স্বপ্নের একটি নীরব প্রতিধ্বনি। তার মুখে এখনো শিশুসুলভ কোমলতার আভা লেগে আছে—যেন সময় থমকে থাকা কোনো নিঃশব্দ দুপুরের আলো। হাসপাতালের সাদা চাদরের ভেতর শুয়ে থাকা সেই ছোট্ট শরীরটি দেখে বোঝা যায়, জীবন কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, আর ভাগ্য কতটা নির্মমভাবে এক নিমিষে সব বদলে দিতে পারে। চোখ দুটো বন্ধ, কিন্তু সেই বন্ধ চোখের ভেতরেও যেন লুকিয়ে আছে এক অসমাপ্ত শৈশব—স্কুলের বেঞ্চ, খেলার মাঠ, বন্ধুর হাসি, মায়ের ডাকে ঘরে ফেরার সেই পরিচিত পথ। আজ সবকিছুই যন্ত্রের শব্দে ঢেকে গেছে। মনিটরের ধারাবাহিক বিপ শব্দ তার নীরব লড়াইয়ের একমাত্র সাক্ষী। তার মুখটি মায়াবী—একেবারে নিষ্পাপ। সেখানে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো প্রশ্ন। শুধু এক গভীর, অব্যক্ত ক্লান্তি, যেন ছোট্ট জীবনটি অনেক বড় বোঝা বইতে বাধ্য হয়েছে অকারণে। কপালের রেখায় জমে থাকা নীরবতা বলে দেয়—এটি কোনো শিশুর জন্য লেখা জীবন ছিল না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবী হয়তো অনেক ব্যস্ত, কিন্তু এই একটি বিছানার চারপাশে সময় যেন থেমে গেছে। সেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন প্রার্থনার মতো ভারী, প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া। রেশমি এখন শুধু একটি শিশু নয়—সে এক নীরব প্রশ্ন, এক অশ্রুভেজা প্রতিচ্ছবি, যা আমাদের বিবেককে বারবার জাগিয়ে তোলে—একটি নিষ্পাপ জীবন কেন এভাবে থেমে যায়? চট্টগ্রামের রৌফাবাদ এখন আর কেবল একটি ভৌগোলিক নাম নয়—এটি এক গভীর বেদনার প্রতীক, এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার নাম, যেখানে একটি ১১ বছরের শিশুর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ যেন পুরো সমাজের বিবেককে নীরব প্রশ্নে বিদ্ধ করছে। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রেশমি আক্তার আজ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের আইসিইউতে শুয়ে আছে। তার ক্ষুদ্র শরীরটি যন্ত্রের সহায়তায় টিকে আছে, আর প্রতিটি যান্ত্রিক শব্দ যেন তার ভেঙে পড়া জীবনের গল্প বলে যায়। বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারটির চোখে আর কোনো ভাষা নেই—শুধু এক অসীম শূন্যতা, এক নিঃশব্দ কান্না, আর অনিশ্চয়তার ভার। রক্তাক্ত সেই বিকেল: একটি শিশু, একটি মৃত্যু, একটি সমাজ ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৭ মে। বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদ এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে মুহূর্তেই বদলে যায় একটি সাধারণ দিন। সেই গুলির শব্দ কেবল একটি মুহূর্তের নয়—তা একাধিক জীবনের ভবিষ্যৎকে থমকে দেয়। সেদিন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ২৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাজু। আর সেই একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় ১১ বছরের রেশমি আক্তার। মাথায় গুলি লাগা একটি শিশুর ছবি—এই বাস্তবতা যে কতটা নির্মম, তা শব্দ দিয়ে পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না।
একটি শিশু—যে হয়তো তখন স্কুলের হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, কিংবা বন্ধুর সঙ্গে হাসাহাসি করার কথা ছিল—সে আজ হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা ও মৃত্যুর ছায়া চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই জানতেন পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। মাথায় গুলি লাগার পরপরই তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে যায়—এটি কোনো সাধারণ অস্ত্রোপচারের বিষয় নয়। চিকিৎসা দল জানায়, রেশমির মাথা থেকে গুলি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। তার শারীরিক অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে অস্ত্রোপচার শুরু করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। মেডিক্যাল বোর্ড বসে, বিশেষজ্ঞরা পর্যালোচনা করেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকে যায় কঠিন ও নির্মম।আজ সে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। প্রতিটি মুহূর্তে তার শরীরের প্রতিক্রিয়া, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস—সবই মনিটরে বন্দী। কিন্তু জীবনের কোনো নিশ্চয়তা সেখানে লেখা নেই।
চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. বাকি বিল্লাহর ভাষায়— “মেয়েটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শুরু থেকেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।” এই বাক্যটি শুধু একটি চিকিৎসা মূল্যায়ন নয়—এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্নের সারসংক্ষেপ, একটি সমাজের ব্যর্থতার দলিল।
আইসিইউর বাইরে এক নিঃশেষ প্রতীক্ষা আইসিইউর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রেশমির পরিবার এখন সময়কে আর সময় হিসেবে দেখে না। প্রতিটি মিনিট তাদের কাছে এক একটি যুদ্ধ, প্রতিটি সেকেন্ড এক একটি আশঙ্কা। মা নেই—বাবার চোখে ক্লান্তি, ভাঙা স্বপ্ন আর অসহায়ত্ব। কেউ কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না। শুধু হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ঠান্ডা করিডোর, আর যন্ত্রের শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা। কখনো কেউ জিজ্ঞেস করে না, এই শিশুটি কী দোষ করেছিল? কেন তার মাথায় গুলি লাগবে? কেন একটি স্কুলপড়ুয়া শিশু মৃত্যুর সঙ্গে লড়বে? সমাজের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের দায়
এই ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠছে—আমরা কেমন সমাজে বাস করছি? রাস্তায় সন্ত্রাসীরা কীভাবে এমনভাবে অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে যেখানে একটি শিশুও নিরাপদ নয়? নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, অপরাধীদের দৌরাত্ম্য, এবং দ্রুত বিচারহীনতার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এমন ঘটনা যেন বারবার ফিরে আসে। প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা, কিছু সংবাদ, কিছু ক্ষোভ—তারপর আবার নীরবতা। কিন্তু রেশমির মতো একটি শিশুর জীবনের মূল্য কি শুধু সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ? মানবতার ভেতরকার ক্ষয়
সবচেয়ে বড় ক্ষতটি হয়তো শারীরিক নয়—মানবিক। আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি যেখানে শিশুর রক্তও আমাদের অভ্যস্ত করে ফেলছে? একটি শিশু যখন গুলিবিদ্ধ হয়, তখন তা শুধু তার পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়—তা পুরো জাতির ব্যর্থতা। কারণ সমাজ যদি তার সবচেয়ে ছোট সদস্যকেও নিরাপদ রাখতে না পারে, তবে সেই সমাজের অগ্রগতির দাবি কতটা বাস্তব? রেশমি: একটি নাম, একটি প্রতীক আজ রেশমি শুধু একটি শিশু নয়। সে একটি প্রতীক—নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার প্রতীক, এবং আমাদের নীরবতার প্রতীক। তার নিঃশ্বাসের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমরা সবাই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই—আমরা কি সত্যিই সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি? শেষ কথা নয়, এক অস্থির অপেক্ষা রেশমির গল্প এখনো শেষ হয়নি। সে বেঁচে ফিরতেও পারে, নাও ফিরতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমা আছে, কিন্তু কখনো কখনো মানুষ প্রার্থনার ওপরও ভর করে। তার পরিবার এখন কোনো যুক্তি চায় না, কোনো বিশ্লেষণ চায় না—তারা চায় শুধু একটি অলৌকিকতা।
কিন্তু সমাজের জন্য এই ঘটনা একটি স্থায়ী প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—আর কত শিশু হারালে আমরা জেগে উঠব? আর কত রেশমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়লে আমরা নিরাপত্তার অর্থ বুঝব? রেশমির নিঃশব্দ কান্না আজ পুরো শহরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমরা কি তা শুনতে পাচ্ছি?


