
-মো. কামাল উদ্দিনঃ
সময় কখনো কখনো নীরব শিক্ষক। সে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—এক বছর আগের কোনো লেখা, কোনো মূল্যায়ন কিংবা কোনো মানুষকে নিয়ে করা কোনো মন্তব্য সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে কি না। ঠিক এক বছর আগে আজকের এই দিনে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ আফতাব উদ্দিনকে নিয়ে। তখন তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করে এক অস্থির সময়ের মধ্যে থানাকে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের পথে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। আজ এক বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই লেখাটি কোনো অতিরঞ্জন ছিল না; বরং বাস্তবতার একটি সৎ মূল্যায়নই ছিল। চট্টগ্রাম মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরনগরী হিসেবে এই শহরের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জনজীবনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফলে এখানে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য প্রতিটি দিনই নতুন এক চ্যালেঞ্জ। চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আফতাব উদ্দিন সেই চ্যালেঞ্জকে সাহসিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি—সব ক্ষেত্রেই তিনি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। ফলাফলও আসে খুব দ্রুত। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তিনি একবার নয়, টানা পাঁচবার “সেরা ওসি” নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্মান নয়; বরং একটি থানার পুরো টিমের সাফল্যের প্রতিফলন। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়—যখন কেউ সৎভাবে কাজ করেন এবং দ্রুত সফলতা অর্জন করেন, তখন কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। আফতাব উদ্দিনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একটি চক্র তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করে। তবে একজন দক্ষ প্রশাসকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি ব্যক্তি নয়, কাজকে মূল্যায়ন করেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ ঠিক সেই ধরনের একজন কর্মকর্তা। তিনি সব সময়ই দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেন। প্রশাসনিক প্রয়োজনে আফতাব উদ্দিনকে পরে বন্দর থানায় বদলি করা হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো নতুন পরিবেশে তার কর্মদক্ষতা আগের মতো থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা আবারও অন্য কথা বলেছে। বন্দর থানায় দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে একই নিষ্ঠা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এর মধ্যেই তার পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। সরকারি উদ্যোগে তিনি চীনে আন্তর্জাতিক পুলিশ ক্রাইম ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। চীনের আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার নানা দিক তিনি সেখানে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। প্রায় এক মাসের এই প্রশিক্ষণ তার পেশাগত অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। দেশে ফিরে তিনি আবারও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরবর্তীতে তাকে বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানে স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করলেও তিনি তার কাজের মাধ্যমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন। এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নির্বাচনকালীন সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব সময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলোতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় তাকে চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থানা কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোতোয়ালি থানা চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র। নগরীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকা এই থানার আওতাভুক্ত। ফলে এখানে দায়িত্ব পালন করা মানেই প্রতিদিন অসংখ্য জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া। তুলনামূলকভাবে বয়স কিংবা চাকরির মেয়াদে হয়তো তিনি অনেকের চেয়ে জুনিয়র, কিন্তু তার দক্ষতা, মেধা ও নেতৃত্বগুণ তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্য করে তুলেছে। পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ তার এই যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করেই তাকে কোতোয়ালি থানার দায়িত্ব দিয়েছেন। একজন দূরদর্শী প্রশাসক হিসেবে তিনি জানেন—যোগ্য মানুষকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হলে তার ফলাফল ইতিবাচক হয়। কোতোয়ালি থানায় দায়িত্ব গ্রহণের পর আফতাব উদ্দিন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময়ের মতো স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা আরও সংগঠিতভাবে কাজ করছে। অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, ছিনতাই প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে একজন প্রকৃত পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু অপরাধী গ্রেফতার করা নয়; বরং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা। একজন নাগরিক যখন থানায় গিয়ে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের আশা করেন, তখন সেই আস্থা রক্ষা করা পুলিশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ থেকেই আফতাব উদ্দিন সব সময় চেষ্টা করেন—থানাকে মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও সহানুভূতিশীল রাখার। সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধ—এই চারটি গুণ একজন সত্যিকারের পুলিশ কর্মকর্তাকে আলাদা করে তোলে। আফতাব উদ্দিনের কর্মজীবনের গত এক বছরের পথচলা সেই বাস্তবতারই প্রমাণ।
এক সময় চান্দগাঁও থানায় তার যে সফলতার সূচনা হয়েছিল, আজ তা বন্দর, বাকলিয়া হয়ে কোতোয়ালি থানায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ যদি এভাবেই যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন, তবে নিঃসন্দেহে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। আজ এক বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—সময়ই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষের পথ কখনো থেমে থাকে না। নানা বাধা, অপপ্রচার কিংবা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়েও তারা তাদের কর্মদক্ষতা দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। ওসি আফতাব উদ্দিনের এই পথচলা তাই শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার গল্প নয়; এটি সততা, সাহস ও পেশাদারিত্বের এক অনুপ্রেরণার গল্প। তার এই ধারাবাহিক সফলতা অব্যাহত থাকুক—এই প্রত্যাশাই

