― Advertisement ―

প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের বর্ষবরণ ও গুনীজন সংবর্ধনা সম্পন্ন

স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে : রাউজান উপজেলার পুর্বআবুরখীল তালুকদারপাড়ায় অবস্থিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে নববর্ষ বরণ, গুনীজন সংবর্ধনা ও...

“বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ঈদ উপহার: অন্ধকার ভয়ের অন্তরালে জেগে ওঠা ভালোবাসার নীরব সৌরভ”

Homeবিনোদন“বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ঈদ উপহার: অন্ধকার ভয়ের অন্তরালে জেগে ওঠা ভালোবাসার নীরব...

-মো.কামাল উদ্দিনঃ ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই আপনজনের কাছে ফিরে আসা, হৃদয়ের গোপন কোণে জমে থাকা ভালোবাসাকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখা। আর এই আনন্দঘন মুহূর্তকে আরও গভীর, আরও অনুভবময় করে তুলতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র নিয়ে এসেছে এক অনন্য নাট্য উপহার—“ভালোবাসার সৌরভ”। নির্মাতা মহসিন চৌধুরীর নিপুণ পরিচালনায়, শফিকুর রহমান শান্তনুর মায়াময় রচনায় এবং ইয়াদ আহমেদের যত্নশীল প্রযোজনায় এই নাটকটি যেন এক আবেগঘন কাব্য—যেখানে প্রেম, ভয়, বিশ্বাস আর মানসিক টানাপোড়েন মিলেমিশে তৈরি করেছে এক হৃদয়ছোঁয়া গল্প। গল্পের শুরুতেই আমরা প্রবেশ করি এক সন্ধ্যার অচেনা নীরবতায়। শহরের কোলাহল থেমে গেছে, বাতাসে অদ্ভুত এক শীতলতা।

সেই নির্জন রাস্তায় হঠাৎ দেখা যায়—এক তরুণী, জ্যোতি, প্রাণভয়ে দৌড়ে চলছে। তার শ্বাস ভারী, চোখে আতঙ্কের ছায়া, যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে—অদৃশ্য কোনো শত্রু, যাকে সে দেখছে, কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। দুই যুবকের ছায়া তার সামনে পড়তেই সে আরও ভীত হয়ে ওঠে, আর সেই আতঙ্কের মধ্যেই হঠাৎ এসে পড়ে একটি গাড়ির সামনে—সৌরভের গাড়ি। এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে যায়—ব্রেকের কর্কশ শব্দ, বিস্ময় আর শঙ্কা—তারপর এক অঘটন এড়ানোর স্বস্তি। এই ঘটনাই বদলে দেয় কয়েকটি জীবনের গতি। সৌরভ, যে কিনা একেবারেই সাধারণ এক যুবক—মানবিক, সংবেদনশীল—সে জড়িয়ে পড়ে জ্যোতির অদ্ভুত এক জগতে। সে জ্যোতিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়, কিন্তু সেই রাতই যেন তাদের জীবনের নতুন গল্পের সূচনা করে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় জ্যোতির বাস্তবতা—সে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। তার মন এক বিভ্রান্ত গোলকধাঁধা, যেখানে ভয় আর কল্পনা মিলে তৈরি করেছে এক ভীতিকর বাস্তবতা। সে বিশ্বাস করে, কেউ তাকে হত্যা করতে চায়। জ্যোতির মা এবং তার চিকিৎসক জাফর বুঝতে পারেন—জ্যোতির সুস্থতার জন্য প্রয়োজন বিশ্বাস, প্রয়োজন এমন একজন মানুষ, যাকে সে নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করতে পারে। আর সেই জায়গাতেই এসে দাঁড়ায় সৌরভ। জ্যোতির কাছে সে হয়ে ওঠে এক ‘সেভিয়ার’—এক আশ্রয়, এক নিরাপত্তার প্রতীক। এরপর শুরু হয় এক নীরব, ধৈর্যশীল যাত্রা—একজন মানুষের আরেকজন মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার গল্প। সৌরভ জ্যোতির পাশে দাঁড়ায়—বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো, কখনো বা অজান্তেই প্রেমিকের মতো। সে তাকে নিয়ে বের হয়, তার ভয় কাটানোর চেষ্টা করে, নিয়মিত ওষুধ খাওয়ায়, তার ভেঙে যাওয়া মনকে ধীরে ধীরে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। এই যত্ন, এই সান্নিধ্য—ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত আবেগে রূপ নেয়। জ্যোতির চোখে সৌরভ শুধু একজন মানুষ নয়—সে তার নিরাপত্তা, তার ভরসা, তার বেঁচে থাকার কারণ।

কিন্তু গল্প এখানে থেমে থাকে না। ভালোবাসা যেমন কোমল, তেমনি জটিলও। সৌরভের জীবনে থাকা লোপা এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না। তার মনে জন্ম নেয় প্রশ্ন—সন্দেহ—অভিমান। সে অনুভব করে, সৌরভ যেন তার হাত ছেড়ে অন্য এক জগতে চলে যাচ্ছে। এই মানসিক টানাপোড়েনের মাঝেই লোপার জীবনে ফিরে আসে তার পুরোনো বন্ধু আদিত্য। আদিত্যের উপস্থিতি লোপার একাকীত্বকে কিছুটা কমায়। তার সান্ত্বনা, তার সহানুভূতি—লোপার মনে নতুন এক অনুভূতির জন্ম দেয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক নতুন সম্পর্কের সূচনা—যা হয়তো ভালোবাসারই আরেক রূপ, অথবা হারানোর বেদনা থেকে জন্ম নেওয়া এক আশ্রয়। অন্যদিকে, সৌরভ ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে জ্যোতির জীবনের গভীরে। সে খুঁজতে থাকে—সেই রাতের রহস্য, যে রাতে জ্যোতির ভয় এত প্রবল হয়ে উঠেছিল। কেন সে দৌড়াচ্ছিল? কী ছিল তার সেই আতঙ্কের উৎস?
সেই অজানা সত্য খুঁজতে খুঁজতেই সৌরভ আরও কাছে চলে আসে জ্যোতির—তার হৃদয়ের, তার স্মৃতির, তার অন্ধকারের।
গল্পটি ধীরে ধীরে এক আবেগঘন চূড়ান্ত মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যায়—যেখানে সত্য, ভালোবাসা এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় প্রত্যেক চরিত্রকে। এই নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি এর আবেগ।

এটি শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়—এটি মানুষের মনের গল্প, ভাঙা বিশ্বাসের গল্প, আবার নতুন করে বাঁচার গল্প। এখানে ভালোবাসা উচ্চস্বরে নয়, বরং নীরবে প্রকাশ পায়—একটি হাত ধরা, একটি আশ্বাস, একটি নির্ভরতার দৃষ্টিতে। অভিনয়ে হাফিজুর রহমান সরুজ, মিলি মুন্সী, মহসিন চৌধুরী, এইচ এম আমিন, রেজাউল কবির চৌধুরী, সীমান্ত বড়ুয়া, তানিশা ইসলাম, সাজু বড়ুয়া এবং সাব্বির আহমেদসহ একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন। বিশেষ করে সাব্বির আহমেদ ও ওয়ারিশা গুনগুনের উপস্থিতি নাটকটিকে আরও প্রাণবন্ত, আরও আবেগঘন করে তুলেছে। “ভালোবাসার সৌরভ” আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ভালোবাসা সবসময় সহজ নয়, ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসা মানে—কারো অন্ধকারে আলো হয়ে থাকা,
কারো ভাঙা মনকে নীরবে জোড়া লাগানো। এই ঈদে, যখন চারদিকে আনন্দের ঢেউ, তখন এই নাটকটি দর্শকদের হৃদয়ে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেবে— একটি প্রশ্ন রেখে যাবে— ভালোবাসা কি শুধু হৃদয়ের, নাকি এটি এক দায়িত্বও।