শিরোনাম
ভারতের হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় আফগান পেসারবিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি: র‍্যাবের জালে মূলহোতা তোফাজ্জলসহ গ্রেফতার ২বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব নয় : ইরানবাজারে ঘুরে বেড়ায় বিশালাকৃতির ২ শতাধিক গুইসাপভূমি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্টদের সেবকের ভূমিকা পালন করতে হবে : ভূমি প্রতিমন্ত্রীসৌদিতে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা ‘শর্তে’ দ্রুত বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাবেএসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই: শিক্ষামন্ত্রীচট্রগ্রাম অভিভাবক ফোরামের ঈদ পুনর্মিলন ও নতুন কার্যকরী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানহাম ও উপসর্গে দেশে আরও ৩ শিশুর মৃত্যুবৃহত্তর লাকসাম সিএন্ডএফ ঐক্য পরিষদের ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ এর ফাইনাল অনুষ্ঠিত

― Advertisement ―

ভারতের হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় আফগান পেসার

ভারতের দিল্লির একটি হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আফগানিস্তান ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম কারিগর ও সাবেক গতি তারকা শাপুর জাদরান। ৩৮ বছর বয়সী এই...

চায়ের কাপে জীবনসংগ্রাম: এক মামুনের গল্প, হাজারো অজানা শিশুর প্রতিচ্ছবি-

Homeসম্পাদকীয়চায়ের কাপে জীবনসংগ্রাম: এক মামুনের গল্প, হাজারো অজানা শিশুর প্রতিচ্ছবি-

-মো.কামাল উদ্দিন
“স্যার চা খাবেন চা… স্যার একটা খান… আমার চা খুবই মজা, খেয়ে দেখেন…”
এই কথাগুলো ছিল খুব সাধারণ, প্রতিদিনের মতোই কোনো পথশিশুর মুখে উচ্চারিত অনুরোধের মতো। কিন্তু জানি না কেন, সেই কণ্ঠস্বর আমার মনকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিল, যেন ভেতরে কোথাও জমে থাকা এক অদৃশ্য বেদনার দরজা হঠাৎ খুলে গেল। গতরাতে একটি বিশেষ কাজে ফয়েজ লেক গিয়েছিলাম মওলানা ইউসুফ ভাইয়ের কাছে। আমার সঙ্গে ছিল ছোট ভাইয়ের মতো মান্নান। প্রথমে আকবর শাহ রেলওয়ে স্টাফদের আবাসিক এলাকায় প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আমরা ফয়েজ লেকের দিকে রওনা হই। আনসার ক্যাম্পের পাশ দিয়ে আব্দুল হামিদ সড়ক ধরে খুলশি টাওয়ারে পৌঁছাই। এই টাওয়ারের মালিক, সুপরিচিত নারী উদ্যোক্তা রাশেদ আকতার মুন্নী ম্যাডাম। তাঁর সঙ্গে বহুদিনের পরিচয়, আন্তরিকতা। সময় খুব কম থাকলেও, মনে হলো একটু বসে কথা বলা যায়। সত্যি বলতে, ফয়েজ লেকে যাওয়ার পরিকল্পনার ভেতরেই ছিল এই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা। মুন্নী ম্যাডামের বাড়ি মিরসরাই, ইউসুফ ভাইয়ের বাড়িও মিরসরাই। তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই পরিচয়, সামাজিক কাজের সূত্রে একটা আত্মিক সম্পর্ক। এই মিলনটাকে তাই আরও আনন্দময় করে তুলেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুন্নী ম্যাডাম গল্পের ফাঁকে বললেন, বাসায় বুয়া নেই, বোনদের মধ্যে ঝগড়া করে কেউ আসেনি। কিন্তু সেই অভাবকে তিনি নিজের দক্ষতায় ঢেকে দিলেন। অল্প সময়েই নিজ হাতে বানিয়ে ফেললেন নানান রকমের মজাদার নাস্তা। সেই আপ্যায়নের মধ্যে ছিল আন্তরিকতা, ছিল হৃদয়ের উষ্ণতা। তবে সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল তাঁর হাতে তৈরি এক কাপ চা। সত্যি বলতে, এত সুন্দর স্বাদের চা আগে কখনো খেয়েছি কি না মনে পড়ে না। হয়তো এটাই প্রথমবার তাঁর বাসায় যাওয়া, প্রথমবার তাঁর হাতে চা খাওয়া—তাই অনুভূতিটা আরও গভীর। কিন্তু সময়ের তাড়া বড় নির্মম। আড্ডা জমে উঠলেও, আমাদের বেরিয়ে আসতে হলো। মনে মনে ভাবলাম, আরেকদিন এই অসমাপ্ত গল্পটাকে আবার শুরু করবো। ফিরে আসার পথে শুরু হলো অন্য এক গল্প। মান্নানের মোটরসাইকেলে জ্বালানি প্রায় শেষ। চারদিকে তেলের সংকট, বেশিরভাগ পাম্পেই তেল নেই। এমন সময় চোখে পড়ল ডায়বেটিস হাসপাতালের পাশের একটি পেট্রোল পাম্পে তেল দেওয়া হচ্ছে। গেট বন্ধ থাকলেও আমরা ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলাম। মান্নান মোটরসাইকেল নিয়ে ভেতরে গেল, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঠিক তখনই সে এলো।
হাতে একটি চায়ের ফ্লাস্ক, বয়স বড়জোর এগারো।
সে বলল, “আঙ্কেল, আপনি ভিতরে যাবেন না?”
আমি বললাম, “না, আমি বাইরে আছি।”
তারপর সেই কণ্ঠ—
“স্যার চা খাবেন চা… আমার চা খুবই মজা…”
তার চোখে তাকাতেই আমি যেন থমকে গেলাম। সেই চোখে ছিল অদ্ভুত এক মায়া, এক ধরনের নির্ভেজাল আবেদন, যা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। আমি তাকে কাছে টেনে নিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি চা বিক্রি করো? কেন করো? তোমার মা-বাবা কোথায়?” সে খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ে আঘাত করছিল। “আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে… মা আছে… বড় বোনের বিয়ে হয়েছে… মা ডাক্তারের চেম্বারে কাজ করে… আমরা ঝাউতলায় থাকি… গ্রামের বাড়ি সীতাকুণ্ড… আমি স্কুলে যাই… ক্লাস ফাইভে পড়ি… আমার বয়স এগারো…” এই কথাগুলো শুনে আমার মনটা ভারী হয়ে গেল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আমার নাতি কাশিবের কথা মনে পড়ল। কী আশ্চর্য মিল—মনে হলো যেন তারা দুজন জমজ ভাই। একই নিষ্পাপ চেহারা, একই চোখের ভাষা। কিন্তু পার্থক্যটা কোথায়?
কাশিবের হাতে খেলনা থাকার কথা, আর এই শিশুর হাতে চায়ের ফ্লাস্ক।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কখন চা বিক্রি করো?”
সে বলল, “সকালে স্কুলে যাই। সন্ধ্যা সাতটা থেকে এখানে আসি। রাত দশ-এগারোটা পর্যন্ত চা বিক্রি করি। তারপর বাসায় গিয়ে পড়ি।” এক ফ্লাস্ক চা বিক্রি করে সে পায় প্রায় চারশো টাকা। সেই টাকা দিয়ে চলে তার স্কুলের খরচ। মা-ছেলের ছোট্ট সংসার, জীবনের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ। আমি প্রতিদিন অনেক পথশিশু দেখি, যারা হাত পেতে ভিক্ষা করে। কিন্তু এই মামুন ভিন্ন। সে ভিক্ষা চায় না, সে কাজ করে বাঁচতে চায়। তার মধ্যে এক ধরনের আত্মসম্মান আছে, যা অনেক বড় মানুষের মধ্যেও দেখা যায় না।
সে আমাকে বলল, “স্যার একটা চা খান…” কিন্তু আমি তখনই মুন্নী ম্যাডামের বাসা থেকে চা খেয়ে এসেছি। কীভাবে তাকে বোঝাই? তবুও আমি তাকে ২০ টাকা দিলাম, দুই কাপ চায়ের দাম হিসেবে। কিন্তু সে টাকা নিতে চাইল না। বলল, “চা না খেলে এমনি টাকা নিবো না…”
তার এই আত্মসম্মান আমাকে আরও নাড়িয়ে দিল।
আমি বললাম, “তুমি আমার হয়ে চা খেয়ে নিও।”
ছবি তুলতে গেলে সে বলল, “ভিডিও করবেন না…”
তার লাজুকতা, তার সরলতা—সবকিছু মিলিয়ে সে যেন এক অমূল্য গল্পের চরিত্র। আমি তাকে বললাম, “তুমি একদিন বড় হয়ে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হবে, আহাদের মতো…” সে চোখ বড় করে তাকাল। তারপর বলল, “স্যার, আমার কিছু বই আর স্কুলের জিনিস দরকার… কিছু টাকা কম আছে… আপনি সাহায্য করবেন?” আমি আমার ভিজিটিং কার্ড তাকে দিয়ে বললাম, “তুমি তোমার মা’কে নিয়ে আমার অফিসে আসো। আমি তোমার এক বছরের সব পড়ার জিনিস কিনে দেব।” সে কার্ডটা হাতে নিয়ে বলল, “আমি শুক্রবার আসতে পারবো… মা চাকরি করে, ছুটি ছাড়া কোথাও যেতে পারে না…” তার এই কথাগুলো আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। বিদায় নেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের কোনো আপনজনকে রেখে যাচ্ছি। আজও আমি অপেক্ষা করছি। মামুন আসবে, তার স্বপ্ন নিয়ে, তার সংগ্রাম নিয়ে। আমি জানি না, এই পৃথিবীতে এমন কত শত, কত হাজার মামুন রয়েছে—যাদের বাবা নেই, বা থেকেও নেই। যারা শৈশবের খেলনা হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতা হাতে তুলে নিয়েছে।
তাদের হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন স্বপ্ন, অথচ তারা ধরে আছে চায়ের ফ্লাস্ক। তাদের চোখে থাকার কথা ছিল দুষ্টুমি, অথচ সেখানে জমে আছে দায়িত্বের ছাপ। এই লেখাটা যদি সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছে পৌঁছায়, যদি একজন মানুষও একটি মামুনের পাশে দাঁড়ায়, তবেই এই লেখার সার্থকতা। আমি শুধু একটি প্রার্থনা করি— মামুন যেন হারিয়ে না যায় এই নির্মম শহরের ভিড়ে। তার স্বপ্ন যেন একদিন সত্যি হয়। আর আমরা—আমরা যেন মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখি।