শিরোনাম
➤বিশেষ প্রতিবেদন দি টুরিস্ট ও চট্রল চিত্র বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের নতুন স্বপ্ন বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিতে চান তিনি কক্সবাজার থেকে সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী থেকে সিলেটের চা বাগান, পর্যটনকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির শক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় মো. কামাল উদ্দিন ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হয়। পর্যটন যে শুধু মানুষের অবকাশযাপন কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বিশ্ব পর্যটন দিবস সেই বার্তাই সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, হাওর, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তায় বাংলাদেশ একটি অসাধারণ পর্যটনভূমি। একদিকে কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্য। কোথাও পার্বত্য চট্টগ্রামের মেঘঢাকা পাহাড়, কোথাও সিলেটের সবুজ চা বাগান। কোথাও কুয়াকাটার সমুদ্র, কোথাও হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার নানা নিদর্শন। এই বিশাল সম্ভাবনাকে আধুনিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিশ্বমানের সেবা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বাংলাদেশের পর্যটনকে সেই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখতে চান। তাঁর পর্যটন ভাবনায় পর্যটন শুধু ভ্রমণ কিংবা বিনোদনের বিষয় নয়। পর্যটন হতে পারে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় খাত এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্ব পর্যটন দিবসে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনা চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের পর্যটনকে প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে একটি আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, রুচিসম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। একটি পর্যটনকেন্দ্র শুধু সুন্দর হলেই পর্যটন উন্নত হয় না। সেখানে যাওয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে। পর্যটকের থাকার জন্য মানসম্মত আবাসন থাকতে হবে। নিরাপদ খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত স্যানিটেশন, জরুরি চিকিৎসা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, দক্ষ গাইড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সহজ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একজন পর্যটক কোনো দেশে এসে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত সেই দেশের পর্যটন ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন উচ্চতায় নিতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশাল সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি কক্সবাজারের রয়েছে পাহাড়, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি, রাখাইন ঐতিহ্য, স্থানীয় খাবার এবং মানুষের জীবনযাপনের বৈচিত্র্য। কক্সবাজারকে শুধু দেশীয় পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে রাখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারেও কক্সবাজারের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এসে শুধু সমুদ্রসৈকত দেখে ফিরে যাবেন না। তিনি যেন পাহাড়ে যেতে পারেন, দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করতে পারেন, সেই ধরনের সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা প্রয়োজন। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা গেলে একজন পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময়ও বাড়ানো সম্ভব। চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম প্রবেশদ্বার বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের কথা বলতে গেলে চট্টগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। চট্টগ্রাম একদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অন্যদিকে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, দ্বীপ, উপকূল, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়। কর্ণফুলী নদী, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, সীতাকুণ্ড, চন্দ্রনাথ, মিরসরাইয়ের পাহাড় ও জলপ্রপাত, বাঁশখালীর উপকূল, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে সমন্বিত করে একটি বড় পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামকে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের শহর হিসেবে নয়, বাংলাদেশের পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবেও নতুন করে ভাবতে হবে। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীর তীরের সৌন্দর্যায়ন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, স্থানীয় খাবার এবং চট্টগ্রামের ইতিহাসকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কর্ণফুলী নিজেই একটি আকর্ষণীয় পর্যটন পণ্যে পরিণত হতে পারে। একজন বিদেশি পর্যটক কর্ণফুলীতে নৌভ্রমণ করবেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস জানবেন, বন্দর দেখবেন, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেবেন এবং পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। এমন একটি সমন্বিত পর্যটন অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের অন্যতম বড় ভাণ্ডার। পাহাড়, মেঘ, ঝরনা, লেক, বন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী খাবার, পোশাক, সংস্কৃতি ও উৎসব সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন অঞ্চলে পরিণত করা সম্ভব। তবে পাহাড়ি পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। পর্যটনের নামে পাহাড় ও প্রকৃতি ধ্বংস নয়, বরং প্রকৃতিকে রক্ষা করেই পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে। সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য পর্যটন সম্পদ সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। বাঘ, হরিণ, কুমির, পাখি, নদী, খাল, গাছপালা এবং জোয়ারভাটার অনন্য জীবন সুন্দরবনকে একটি অসাধারণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে। সুন্দরবনে পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা, নৌযান চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সিলেটের চা বাগান ও হাওরেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সমুদ্র ও পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল এবং হাওরাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অনন্য আকর্ষণ হতে পারে। বর্ষায় হাওরের বিশাল জলরাশি এবং শুষ্ক মৌসুমে তার পরিবর্তিত রূপ পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, লোকসংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করা গেলে হাওরভিত্তিক পর্যটন একটি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার, জমিদারবাড়ি এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, বাগেরহাটসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। একজন বিদেশি পর্যটক শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা দেখতে চান না। তিনি জানতে চান সেই স্থাপনার ইতিহাস, নির্মাণের গল্প, মানুষের জীবন এবং সেই সভ্যতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সম্পর্ক। তাই পর্যটনে গল্প বলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় খাবারও হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ড বাংলাদেশের খাবারের বৈচিত্র্য বিশ্ব পর্যটনের একটি আকর্ষণীয় সম্পদ হতে পারে। চট্টগ্রামের মেজবানি, কালাভুনা, শুঁটকি ও সামুদ্রিক খাবার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, সিলেটের বিভিন্ন খাবার, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার, বাংলাদেশের মিষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় কৃষিপণ্যকে পর্যটনের অংশ করা সম্ভব। পর্যটক একটি দেশকে শুধু চোখ দিয়ে দেখেন না, অনেক সময় খাবারের স্বাদের মধ্য দিয়েও একটি দেশকে মনে রাখেন। তাই বাংলাদেশের স্থানীয় খাবারকে পরিচ্ছন্নতা, মান এবং নান্দনিক পরিবেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা প্রয়োজন। পর্যটনের সুফল পৌঁছাতে হবে স্থানীয় মানুষের ঘরে পর্যটন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো স্থানীয় জনগণকে এর অংশীদার করা। একটি পর্যটনকেন্দ্রে হোটেল তৈরি হলো, রাস্তা হলো, পর্যটক এলেন, কিন্তু স্থানীয় মানুষ যদি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত না হন, তাহলে সেই পর্যটন উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ অর্থে টেকসই হবে না। স্থানীয় তরুণদের পর্যটন গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় নারীদের হস্তশিল্প, খাবার, হোমস্টে এবং ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষক, জেলে, মাঝি, কারিগর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাবে। তরুণরাই হতে পারেন পর্যটনের নতুন দূত বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী পর্যটন শিল্পের বড় শক্তি। বিদেশি ভাষা, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, গাইডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ এবং আতিথেয়তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের পর্যটন শিল্পে যুক্ত করা গেলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একজন দক্ষ পর্যটন গাইড শুধু একজন গাইড নন। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার একজন দূত। নারীর জন্যও খুলে যেতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা পর্যটন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, হোমস্টে, পর্যটন গাইড, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, অনলাইন পর্যটন ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের যুক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের পর্যটনকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পর্যটন শুধু অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখবে। পর্যটনকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় খাতে পরিণত করতে হবে আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিনোদনকেন্দ্র, নৌপর্যটন, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো ট্যুরিজম, ওয়েলনেস পর্যটন এবং সম্মেলন পর্যটনে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ প্রক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা গেলে পর্যটন শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। ডিজিটাল পর্যটন হবে আগামী দিনের বাস্তবতা বিশ্বের পর্যটন ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগেই যেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় খাবেন, কত খরচ হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যোগাযোগ করবেন, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডিজিটাল ম্যাপ, বহুভাষিক ওয়েবসাইট, পর্যটন অ্যাপ এবং ভার্চুয়াল পর্যটন নির্দেশনা বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে পারে। নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাই পর্যটনের ভিত্তি পর্যটন যতই সুন্দর হোক, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পায় না। পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকবান্ধব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধার ব্যবস্থা, তথ্য সহায়তা, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যটকের কাছে বাংলাদেশের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের আচরণ ও সেবার মানও দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে। পরিবেশ রক্ষা ছাড়া পর্যটনের ভবিষ্যৎ নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ হচ্ছে প্রকৃতি। তাই পর্যটনের নামে পাহাড় কাটা, নদী দখল, বন ধ্বংস, সৈকত দূষণ কিংবা জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা যাবে না। পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি থাকবে, পর্যটক আসবেন, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই সৌন্দর্য উপভোগ করবে, এমন ভারসাম্যপূর্ণ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদী ও জলভিত্তিক পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা নদীমাতৃক বাংলাদেশকে নদীভিত্তিক পর্যটনের দেশ হিসেবেও বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সম্ভব। কর্ণফুলী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা এবং দেশের অসংখ্য নদী ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং স্থানীয় জীবনযাপনের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের একটি আধুনিক নদী পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এটি দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। মেডিকেল, ওয়েলনেস ও সম্মেলন পর্যটনের সম্ভাবনা পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে মেডিকেল ও ওয়েলনেস পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ব্যবসায়িক সভা, প্রদর্শনী ও করপোরেট আয়োজনের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করা সম্ভব। একজন ব্যবসায়ী বা সম্মেলনের অতিথি বাংলাদেশে এসে যদি একই সফরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সুন্দরবন কিংবা অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করেন, তাহলে ব্যবসা ও পর্যটন উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশের পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে আন্তঃআঞ্চলিক পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার মধ্যে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার। কক্সবাজার থেকে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে রাঙামাটি। চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই। খুলনা থেকে সুন্দরবন ও বাগেরহাট। সিলেট থেকে জাফলং, রাতারগুল ও হাওর। ঢাকা থেকে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। এভাবে একাধিক পর্যটনকেন্দ্রকে একটি প্যাকেজে যুক্ত করা গেলে পর্যটকের বাংলাদেশে অবস্থানের সময় বাড়বে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে নতুন বাংলাদেশ বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে শুধু সস্তা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে। এটি নদীর দেশ। এটি সমুদ্রের দেশ। এটি পাহাড়ের দেশ। এটি সুন্দরবনের দেশ। এটি হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দেশ। এটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ। এটি অতিথিপরায়ণ মানুষের দেশ। এই গল্পকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিশ্ব পর্যটন মেলার মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, তথ্যচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যটন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরা তাঁদের এলাকার প্রকৃতি, ইতিহাস, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গভীরভাবে তুলে ধরতে পারেন। পর্যটন উন্নয়নে গবেষণা প্রয়োজন কোন দেশের পর্যটক বাংলাদেশে আসতে চান? তাঁরা কী দেখতে চান? কতদিন থাকতে চান? কত টাকা ব্যয় করতে আগ্রহী? কোন পর্যটনকেন্দ্র তাঁদের বেশি আকর্ষণ করে? কেন অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে যান? এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। পর্যটন উন্নয়নে নিয়মিত পর্যটক জরিপ, বাজার গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবণতা বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। সামনে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের পর্যটন ভাবনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন রয়েছে। যেখানে কক্সবাজার হবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সুন্দরবন হবে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের অন্যতম ক্ষেত্র। সিলেট হবে চা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনন্য গন্তব্য। চট্টগ্রাম হবে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন্দর ও ঐতিহ্যের সমন্বিত পর্যটন প্রবেশদ্বার। দেশের প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্ব পর্যটনের সামনে নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরবে। প্রয়োজন সম্মিলিত জাতীয় উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বেসরকারি বিনিয়োগকারী, পর্যটন ব্যবসায়ী, হোটেল রেস্তোরাঁ শিল্প, পরিবহন খাত, স্থানীয় জনগণ এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ। পর্যটনের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। প্রয়োজন পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। প্রয়োজন পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের সম্পদ তৈরি করতে হবে না। প্রকৃতি আমাদের সম্পদ দিয়েছে। আমাদের রয়েছে সমুদ্র। আমাদের রয়েছে পাহাড়। আমাদের রয়েছে নদী। আমাদের রয়েছে সুন্দরবন। আমাদের রয়েছে দ্বীপ। আমাদের রয়েছে হাওর। আমাদের রয়েছে ইতিহাস। আমাদের রয়েছে ঐতিহ্য। আমাদের রয়েছে সংস্কৃতি। আমাদের রয়েছে জীববৈচিত্র্য। আর রয়েছে মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। এখন প্রয়োজন এই সম্পদকে আধুনিক পরিকল্পনা, বিশ্বমানের অবকাঠামো, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত কর➤“বিশ্ব পর্যটন দিবস: চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন দিগন্ত-➤হাটহাজারীতে বিদেশি পিস্তল ও ওয়ান শুটারগানসহ গ্রেপ্তার ১➤জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম, দুশ্চিন্তায় মানুষ➤চট্টগ্রাম রেঞ্জে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী অপরাধের অন্ধকারে আলোর সন্ধান, মাঠে নেমেই কঠোরতার বার্তা➤রাউজানে মানব কল্যাণে ধম্মকথার ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন➤বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি ৫৬ বছরের ঐতিহ্য, হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং বোয়ালখালীবাসীর প্রত্যাশা➤কোতোয়ালী পুলিশের অভিযানে চুরি-ছিনতাইসহ একাধিক মামলার আসামি হেলালসহ গ্রেপ্তার ৩➤চট্টগ্রামের স্বার্থে একজন চেয়ারম্যানকে কাজ করতে দিন | নগর পরিকল্পনার কঠিন পথে বাধা নয়, চাই সত্য, প্রমাণ ও আইনের শাসন➤উৎপাদন বাড়লে হাতের নাগালে আসতে পারে ইলিশের দাম

― Advertisement ―

বিশেষ প্রতিবেদন দি টুরিস্ট ও চট্রল চিত্র বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামানের নতুন স্বপ্ন বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিতে চান...

বিশেষ প্রতিবেদন : মো. কামাল উদ্দিন ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এই দিবস পালিত হয়। পর্যটন যে শুধু...

বাউল থেকে বাউল মোজাহের : আধ্যাত্মিক সুর, চট্টগ্রামের গর্ব ও এক মানুষের সঙ্গীতময় সাধনা-

Homeসম্পাদকীয়বাউল থেকে বাউল মোজাহের : আধ্যাত্মিক সুর, চট্টগ্রামের গর্ব ও এক মানুষের...

—মো. কামাল উদ্দিনঃ
অজস্র নদী, অসংখ্য জনপদ আর হাজার বছরের লোকঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাংলার আত্মা যখন শব্দ পায়, তখন তাকে আমরা বাউল বলি। বাউল—শুধু গায়ক নয়, শুধু আধ্যাত্মিক সাধকও নয়; তিনি এক অন্তহীন যাত্রার পথিক, যিনি মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজতে বের হন সুরের ভেলায় ভর করে। তিনি কখনও অচেনা পথিক, কখনও গ্রামের হাটে দাঁড়ানো স্বপ্নবাহক, আবার কখনও জনমানুষের হৃদয়ের গভীরে থাকা প্রিয়জনের আর্তি। বাউল হলেন সেই গায়ক, যার কণ্ঠে স্বর্গ আর মাটির মিশ্র সুর। যার সঙ্গীতে সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া, নাগরিক ব্যাকুলতা এবং অন্তরপুরুষের সন্ধান একই সুরে বাঁধা। এই বাউল ঐতিহ্য শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা বা মেঘালয়ের কোনো নির্দিষ্ট প্রান্তিক মানুষের সম্বল নয়; এটি সমগ্র বাংলা জাতিসত্তার আত্মিক উত্তরাধিকার। এই ঐতিহ্য ২০০৫ সালে ইউনেস্কোর মানবতার মৌখিক ও অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত হয়েছে—বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে, বাংলার মাটির গন্ধ, আকাশের রঙ, মানুষের অন্তর্গানকে ধ্বনি দেওয়া এক অমূল্য সম্পদই হলো বাউল। এই ইতিহাস, এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের বুকে জন্মেছে অসংখ্য বাউল, সুফি, কবিয়াল, সাধক; আর সেই ধারারই সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকাদের একজন—বাউল মোজাহের। যার কণ্ঠে আজও বেজে ওঠে বাংলা, চট্টগ্রাম, সুফিবাদ, প্রেম, মানবধর্ম আর আধ্যাত্মিকতার দিগন্ত। এই লেখাটি সেই সকল বাউলের ইতিহাস, পাশাপাশি এক বাউল শিল্পীর অন্তর্জাগতিক পথচলার সাক্ষ্য—যিনি আজকের চট্টগ্রামের গর্ব, বোয়ালখালীর কৃতিমান সন্তান মোজাহিদ। বাউল শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকেই শুরু করা যাক। সংস্কৃত ‘ভাতুল’—যার অর্থ উন্মাদ, পাগল; কেউ বলে ‘ব্যাকুল’—অধীর-উদ্বিগ্ন। আবার কেউ কেউ বলেন, এর উৎস ফারসি ‘আউল’—যার অর্থ পথিক, আল্লাহমগ্ন দরবেশ। অন্য গবেষণার দাবি‘বা‘আল’, সুফিবাদের এক প্রাচীন শাখা। অর্থাৎ বাউল কোনো একটি পথ নয়; এটি বহু তীর, বহু স্রোত, বহু দর্শনের মিলন। বাংলা ভাষার প্রথম দিকের গ্রন্থ—চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত—এ ‘বাউল’ শব্দটি দেখা যায়। কিন্তু এই শব্দ কবে ‘উন্মাদ’ অর্থ ছাড়িয়ে একটি ধর্মীয়-দার্শনিক সম্প্রদায়ের পরিচয় হয়ে উঠল, সেটি নিয়ে আজও বিতর্ক আছে। যা নিশ্চিত—বাউলের কোনো প্রতিষ্ঠাতা নেই। বাউল কোনো ধর্ম নয়—এটি এক অনুভূতির পথ।বাউল একদিকে সুফি, অন্যদিকে বৈষ্ণব; তিনি দেহতত্ত্ব অনুসরণ করেন, আবার দেহের বাইরেও সমগ্র মহাবিশ্বকে অনুভব করেন। জীবনের পরম সত্যকে খোঁজেন মানুষের মধ্যেই—দূর আকাশে নয়, দূরের কোনো ঈশ্বরেও নয়। তাই লালন শাহ গেয়েছেন— “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি…” এই তত্ত্ব, এই দর্শনই বাউলকে আলাদা করে।
বাংলাদেশে বাউল ঐতিহ্য সবচেয়ে গভীরভাবে বিকশিত হয়েছিল কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অঞ্চলে। তবে চট্টগ্রামের ইতিহাসেও বাউলের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। চট্টগ্রাম হচ্ছে বার আউলিয়ার ভূমি—এক এমন অঞ্চল যেখানে সুফিবাদ, লোকসাধনা, মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিকতা এবং কবিয়ালি গানের জোয়ার একই সঙ্গে বইত। এই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী—আপনার আমার জন্মভূমি বহু যুগ ধরে ছিল আধ্যাত্মিক শিল্পীদের উর্বর ক্ষেত্র। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি কবিয়াল রমেশ শীল, যার গান, কবিতা, কবিয়াল লড়াই, মানবধর্মী দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রমেশ শীলের মধ্যে মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল খাঁটি বাউলীয় ভাবধারা। এই অঞ্চলের মাটিতে তাই নতুন বাউলের জন্ম হওয়া কোনো বিস্ময় নয়। কারণ চট্টগ্রাম হলো সেই পবিত্র ভূখণ্ড— যেখানে গান শুধু গান নয়, গান আধ্যাত্মিকতার সিঁড়ি। গান মানবতার ভাষা। গান মানুষের মুক্তির পথ। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছেন আজকের আমাদের গর্ব—বাউল মোজাহিদ। যখন সারা বাংলাদেশে বাউল শিল্পীকে ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, কেউ বাউল নাম ব্যবহার করে অনৈতিকতা করেছে, কেউ বাউলের গানকে বিকৃত করেছে, অন্য কেউ আবার স্বার্থে বাউল পরিচয় নিয়েছে,ঠিক সেই সময়েই আমি বসলাম লিখতে চট্টগ্রামের বাউল সম্রাট মোজাহের-কে নিয়ে। কারণ মোজাহিদ ভন্ড নয়। তিনি আলো। তিনি শুদ্ধতা। তিনি সাধনার সুর। চট্টগ্রামের আঙিনায় আজও যদি কেউ পূর্ণরূপে বাউল দর্শনের শুদ্ধতা বহন করে থাকে—তবে তিনি মোজাহের। তার পোশাকে, তার আচার-আচরণে, তার গানের বাচনভঙ্গিতে, তার চলনে-বলনে—সবকিছুতেই বাউল দর্শনের গভীর রস রয়েছে। তিনি শুধু গান করেন না; তিনি গান হয়ে ওঠেন। মানুষ তার কাছে শুধু শ্রোতা নয়; তারা সঙ্গীতের সাধনার সঙ্গী। এবং সবচেয়ে বড় কথা— তার জন্ম চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে।
এই এলাকায় বাউল সাধনার ঐতিহ্য বহু পুরনো—রমেশ শীল থেকে শুরু করে অসংখ্য লোকশিল্পী, সুফি, সাধক—যারা চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। মোজাহিদ সেই ধারারই উত্তরসূরি। মোজাহিদের কণ্ঠে এমন এক বিশেষ শক্তি আছে, যা শ্রোতাকে খুব সহজে আকৃষ্ট করে ফেলে। তার কণ্ঠ মাদক নয়— তার কণ্ঠ মুক্তি। তিনি যখন আধ্যাত্মিক গান করেন— মনে হয় যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে পথ দেখাচ্ছে।  যখন বাউল গান করেন,মনে হয় লালন কিংবা রমেশ শীল পুনর্জন্ম নিয়েছেন। যখন ভাটিয়ালি করেন। মনে হয় নদী ভেসে যাচ্ছে তার গলার সুরে। যখন ভান্ডারী গান করেন। মনে হয় মাইজভান্ডার দরবারের আলো ঝলমল করছে। যখন আধুনিক পল্লীগীতি করেন—  মনে হয় এক মায়াবী জগৎ সামনে খুলে যাচ্ছে।  সবচেয়ে বড় কথা—তার মুখস্থ গান কয়েক হাজার। এটি শুধু প্রশংসা নয়, অভাবনীয় বাস্তবতা। আজকের সময়ে যেখানে শিল্পীরা মোবাইল স্ক্রিন থেকে লিরিক পড়ে গান করেন, সেখানে মোজাহিদ গান মুখস্থ করেন মন দিয়ে, আত্মা দিয়ে। গান তার মগজে নয়; গান তার রক্তে।
মোজাহের সঙ্গীতভুবন বর্ণনা করতে গেলে বিস্ময় জাগে। তিনি একই সঙ্গে— সুফি ভাটিয়ালি পল্লীগীতি, ভান্ডারী বাওয়ালি কাওয়ালী, লোক গীতি, আধ্যাত্মিক গান সব গাইতে পারেন। এবং সবই একেবারে শুদ্ধ উচ্চারণে, সঠিক সুরে। তার গান শুরু করলে শ্রোতা আর যেতে পারে না। এক গান শুনতে শুনতে আরও গান, আরেক গান… সমস্ত পরিবেশ যেন এক সম্মোহনের জাদুতে ঢেকে যায়। এ সময়ে অনেক শিল্পী আছেন যারা জনপ্রিয়তার জন্য বিতর্ক সৃষ্টি করেন, অশালীন কথা বলেন,
ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করেন, অথবা বাউল ধারাকে বিকৃত করেন। কিন্তু মোজাহের তিনি এদের কেউ নন। তিনি শুদ্ধ বাউল। তার মধ্যে কোনো ভণ্ডামি নেই। তিনি কখনো ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করেন না। সব ধর্মের মানুষের কাছে তার সমান গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— তিনি নিজের গান নিজে লেখেন, নিজে সুর করেন, নিজেই গেয়ে তোলেন। এটি তাকে করে তুলেছে ওস্তাদের পর্যায়ের শিল্পী। চট্টগ্রামের প্রতিটি সংস্কৃতি সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পর্ক উষ্ণ, গভীর এবং পারস্পরিক সম্মানের।
বিশেষ করে চাটগাঁইয়া নওজোন—চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনমোজাহের এখানে একজন নিয়মিত শিল্পী। তার গান শুধু মঞ্চে নয়, মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে সাংবাদিক, লেখক, টেলিভিশন উপস্থাপক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের—সবাইয়ের। আমার সৌভাগ্য— তিনি আমার বোয়ালখালীর মানুষ। সেই মাটিরই সন্তান। সেই নদীরই ধারে বেড়ে ওঠা। সেই ইতিহাসেরই ধারক। মোজাহের শুধু চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের পরিচিত নাম এখন। তার গান ইউটিউবে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিভিন্ন টেলিভিশন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে গেছে।বিদেশেও প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে,তার অসংখ্য শ্রোতা। যেখানেই তিনি গান করেছেন, সেখানে শ্রোতারা তাকে বাউল মোজাহের নয়, সুরের দরবেশ হিসেবেই স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাউল সঙ্গীত নিয়ে অনেক বিতর্ক দেখা গেছে। কেউ বাউলের পোষাক পরে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে, কেউ ধর্মীয় উস্কানিমূলক লিরিক ব্যবহার করে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, কেউ গানকে করেছে বাণিজ্যিক অশ্লীলতায় ভরা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে— মোজাহিদ যেন সেই অন্ধকারে আলো জ্বালানো মানুষ। তিনি যে বাউল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি যে শুদ্ধ এ নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই। কারণ তার জীবনই প্রমাণ মানবতা, গান, আধ্যাত্মিকতা এবং সৎ শিল্প সাধনাই তার নীতি। যে মানুষ হাজার হাজার গান মুখস্থ রাখে সে শুধু শিল্পী নয়; সে মানবস্মৃতি ও সুরের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। যে মানুষ নিজের গান নিজেই লেখে সে শুধু গায়ক নয়; সে কবি। সে দার্শনিক। যে মানুষ সমস্ত ধর্মের মানুষকে সমভাবে সম্মান করে সে শুধু বাউল নয়; সে মানবধর্মী সাধক। যে মানুষ কারও সাথে বিরোধ করেন না, সে শুধু জনপ্রিয় নয়; সে মহানুভব মোজাহের মধ্যে এই সবই আছে। এ কারণে আজ তিনি চট্টগ্রামের গর্ব, বোয়ালখালীর আলো, বাংলার বাউল ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। আজ যখন বাউলের শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ, যখন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যখন মানুষ জানতে চায় আসল বাউল কে? তখন আমি লিখতে বসলাম বাউল মোজাহিদ-কে নিয়ে। কারণ তিনি সেই মানুষ— যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝবে বাউল মানে কী, সুফিবাদ মানে কী, মানবধর্ম মানে কী, সাধনা মানে কী, এবং শিল্পীর প্রকৃত দায়িত্ব কী। তিনি গান করেন, গান দিয়ে বাঁচেন, মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষকে এক করেন। এটাই তো বাউল। এটাই তো শিল্পী। এটাই তো সাধনা। চট্টগ্রামের মাটিতে এমন শিল্পী জন্মায় এটাই আমাদের গর্ব। এটাই আমাদের সৌভাগ্য। এটাই আমাদের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি।বাউল মোজাহের শুধু একজন শিল্পী নন,তিনি এক আলোকবর্তিকা, যিনি বাউল ঐতিহ্যের হাজার বছরের সুরকে আজও সমান আবেগে, সমান শুদ্ধতায় বহন করে চলেছেন। তার কণ্ঠে যে জাদু তা প্রজন্মকে টানবে, মানুষকে জাগাবে, বাংলা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমরা গর্ব করি তিনি আমাদের চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের বোয়ালখালীর সন্তান। আমাদের দেশের বাউল ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।