শিরোনাম
২২তম স্মরণ সভায় সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা- সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন নিরহংকারী, নীতিবান, মানবতাবাদী ও সমাজহিতৈষী মানুষসরকার বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার ১৩ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে।তেলের দাম বাড়ল, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা অব্যাহতভয়াবহ আগুনে বানিয়াচং বাজারে ৯ দোকান পুড়ে ছাই“২২ এপ্রিল: জন্ম এক মানুষের, জাগরণ এক ইতিহাস—লেনিনের আলোয় বিশ্ব ও আমার দেখা”প্রজ্ঞানন্দ স্মৃতি সংসদের নতুন কমিটি গঠিত২৪ ঘণ্টায় সাত খুন: জামায়াত আমিরের ক্ষোভ, সরকারের সমালোচনাদুই আসনের নির্বাচনী নথি সংরক্ষণের নির্দেশরাজনীতির ছায়ায় শিক্ষা ক্যাম্পাস: চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে সংঘর্ষ, আতঙ্কে সাধারণ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার দিনে অস্থিরতা-এবার ‘দম’ দেখবে সারা দেশ

― Advertisement ―

তাদের ঈদ : অশ্রুর ভেতর আলোর খোঁজ

Homeআন্তর্জাতিকতাদের ঈদ : অশ্রুর ভেতর আলোর খোঁজ

মো. কামাল উদ্দিন
রাতের শহরটা যেন এক অদ্ভুত মায়াজালে মোড়া। চারদিকে আলো, রঙিন ব্যানার, দোকানের কাঁচে ঝলমলে প্রতিফলন—সবকিছু মিলিয়ে যেন আনন্দের এক মহোৎসব। মানুষের চোখে উচ্ছ্বাস, হাতে ব্যাগ, মুখে তৃপ্তির হাসি। কেউ শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত, কেউ পরিবারের জন্য ভালোবাসা কিনে নিচ্ছে নতুন জামার ভাঁজে ভাঁজে। কিন্তু এই আলোয় ঢাকা পড়ে যায় কিছু অন্ধকার—যেগুলো দেখা যায় না, কিংবা আমরা দেখতে চাই না। ফুটপাতের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা শিশু। তাদের চোখে আলো নেই, আছে কেবল প্রতিফলন—অন্যের আনন্দের প্রতিফলন। তাদের শরীরে ছেঁড়া জামা, পায়ে জুতো নেই, চুল এলোমেলো। তারা কিছু চায় না—শুধু তাকিয়ে থাকে। যেন এই তাকিয়েই তারা ঈদকে ছুঁতে চায়, দূর থেকে। তাদের ভিড়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে জসিম। বয়স আট কিংবা নয়। সে জানে না ঈদের প্রকৃত অর্থ কী, কিন্তু সে জানে আজ অন্যদিনের মতো না। আজ মানুষ বেশি খুশি, আজ খাবারের গন্ধ একটু বেশি তীব্র, আজ তাকে হয়তো কেউ একটা মিষ্টি দেবে। তার পেটটা খালি। কিন্তু সে অভ্যস্ত। ক্ষুধার সঙ্গে তার এক ধরনের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। তবুও ঈদের দিনে ক্ষুধাটা একটু বেশি লাগে—কারণ চারপাশে সবাই খাচ্ছে। জসিম একবার দোকানের দিকে তাকায়—কাচের ভেতরে সাজানো রঙিন জামা। তার চোখে হালকা একটা ঝিলিক আসে। হয়তো সে কল্পনা করে—ওই জামাগুলোর একটি যদি তার হতো! কিন্তু সেই কল্পনাটুকুও বেশিক্ষণ থাকে না। বাস্তবতা তাকে টেনে নামায় মাটিতে। সে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। তার ঈদ মানে—হয়তো একটা শুকনো রুটি, অথবা কারো ফেলে দেওয়া খাবার। শহরের অন্য প্রান্তে আমেনা বেগম বসে আছেন। বয়স তার ষাট পেরিয়েছে। মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখে আছে এক গভীর শূন্যতা। একসময় তারও সংসার ছিল। ঈদের দিন মানে ছিল নতুন শাড়ি, রান্নাঘরে ব্যস্ততা, অতিথিদের আনাগোনা। তার স্বামী বাজার থেকে গরুর মাংস এনে দিতেন, ছেলেমেয়েরা হৈচৈ করত, ঘর ভরে থাকত হাসিতে।
আজ সেই ঘর নেই, সেই মানুষগুলো নেই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি এখন একা। ভিক্ষাবৃত্তিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। ঈদের চাঁদ উঠেছে—মানুষ ছুটে গেছে আনন্দে, কিন্তু আমেনা বেগমের চোখে সেই চাঁদ কোনো আলো ছড়ায় না। তার কাছে ঈদ মানে—একটা দীর্ঘশ্বাস, একটা না-পাওয়ার ইতিহাস। সকালে তিনি তার পুরোনো শাড়িটা পরবেন। শাড়িটা খুব ভালো না, কিন্তু এটিই তার সবচেয়ে ভালো। হয়তো কেউ তাকে একবেলা খাবার দেবে—এই আশাটুকু নিয়েই তিনি ঈদের সকাল শুরু করবেন। তার ঈদ মানে স্মৃতি—আর সেই স্মৃতির ভেতর লুকানো এক নিঃসঙ্গ কান্না। সোহেল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স বারো-তেরো। তার চোখে স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো এখন বাস্তবতার চাপে চাপা পড়ে গেছে। তার মা একটি বাসায় কাজ করেন। ঈদের আগে কাজ বেড়ে যায়—ঘর পরিষ্কার, রান্না, অতিথি আপ্যায়ন—সবকিছুতেই ব্যস্ত তিনি। সোহেল মাঝে মাঝে সেই বাসায় যায়। দেখে, তার সমবয়সী ছেলেটা নতুন জামা পরে ঘুরছে, হাতে নতুন খেলনা। তার বুকের ভেতরটা হালকা করে কেঁপে ওঠে। সে কিছু বলে না। সে জানে, তার মা চাইলেও তাকে নতুন জামা দিতে পারবেন না। ঈদের দিন সকালে সে হয়তো একটা পরিষ্কার পুরোনো জামা পরে বের হবে। মানুষের ভিড়ের মাঝে হাঁটবে, কিন্তু কোথাও নিজেকে খুঁজে পাবে না। তার ঈদ মানে—চাওয়া, কিন্তু না পাওয়া। একজন রিকশাওয়ালা—তার নাম কেউ জানে না। সারাদিন শহরের মানুষের বোঝা টেনে নিয়ে চলে সে। তার ঘাম, তার ক্লান্তি—সবকিছু মিলিয়ে সে এই শহরের নীরব শ্রমিক। ঈদের আগের রাতেও সে কাজ করে। কারণ সে জানে—এই সময়টায় একটু বেশি আয় করা যায়। তার স্ত্রী-সন্তান গ্রামে থাকে। সে তাদের জন্য টাকা পাঠিয়েছে। কিন্তু নিজের জন্য কিছু রাখেনি। নতুন লুঙ্গি কেনার কথা ছিল—হয়নি। ঈদের দিন সে তার পুরোনো পাঞ্জাবিটাই পরবে। তারপর আবার রাস্তায় বের হবে। কারণ তার ঈদ মানে—কাজ। তার আনন্দ তার পরিবারের মুখে, দূরে কোথাও। লুৎফা বেগমের গল্পটা আরও কষ্টের।
তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। ঈদের দিন তিনি রান্না করেন—পোলাও, কোরমা, সেমাই—সবকিছু তার হাত দিয়েই তৈরি হয়। কিন্তু তার নিজের ঘরে? সেখানে হয়তো কিছুই নেই। তার পাঁচ বছরের মেয়ে রীমা তার দিকে তাকিয়ে বলে, “আম্মু, আমার জন্য একটা জামা আনবে?” এই প্রশ্নের উত্তর নেই লুৎফার কাছে। তিনি শুধু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তার চোখে জল আসে, কিন্তু সে জল তিনি লুকিয়ে ফেলেন। রাতে যখন রীমা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন লুৎফা চুপচাপ বসে থাকেন। তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগে—একটা অদৃশ্য শূন্যতা, যা কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না। তার ঈদ মানে—ত্যাগ, না-পাওয়া, আর নীরব কান্না। আর সেই একাকী বৃদ্ধা—আমেনা খালা। তার ছেলেরা বিদেশে। তারা ব্যস্ত নিজেদের জীবনে। ঈদের দিনে কেউ ফোন করে না, কেউ খোঁজ নেয় না। তিনি বারান্দায় বসে থাকেন। রাস্তায় মানুষ দেখে। শিশুদের হাসি শোনেন।
একসময় তার বাড়িতেও এমন হাসি ছিল। আজ সেই হাসি নেই—শুধু স্মৃতি আছে। তিনি আস্তে করে বলেন,
“এটাই কি জীবন?” তার ঈদ মানে—অপেক্ষা। একটি ফোন কলের, একটি দরজায় কড়া নাড়ার, একটি ভালোবাসার।
এইসব গল্প আলাদা নয়—এগুলো একই গল্পের বিভিন্ন রূপ। এগুলো আমাদের সমাজের আয়না—যেখানে আমরা নিজেদের দেখতে পাই, কিন্তু দেখতে চাই না। ঈদ আমাদের জন্য আনন্দের, কিন্তু তাদের জন্য বেদনার। তবুও, প্রশ্নটা থেকে যায়—
এই বেদনার দায় কি আমাদের না? আমরা যদি চাই, এই গল্পগুলো বদলাতে পারে। একটি শিশুর হাতে যদি আমরা একটি নতুন জামা তুলে দিই—সে হয়তো সারা জীবন সেই মুহূর্তটা মনে রাখবে। একজন বৃদ্ধার পাশে যদি আমরা কিছুক্ষণ বসি—তার নিঃসঙ্গতা কিছুটা হলেও কমে যাবে। একজন দরিদ্র পরিবারের জন্য যদি আমরা ঈদের খাবার পৌঁছে দিই—তাদের ঈদ সত্যিকারের ঈদ হয়ে উঠবে। ঈদ কেবল নিজের জন্য নয়। এটা ভাগ করে নেওয়ার উৎসব। আমরা যদি আমাদের আনন্দের একটু অংশ তাদের সঙ্গে ভাগ করি—তাহলেই ঈদের অর্থ পূর্ণ হবে। চলুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি— আমরা কাউকে একা ঈদ কাটাতে দেব না, আমরা কাউকে ক্ষুধার্ত রেখে আনন্দ করব না, আমরা কাউকে বঞ্চিত রেখে উৎসব উদযাপন করব না। জসিমের হাতে আমরা মিষ্টি তুলে দেব, রীমার জন্য আমরা নতুন জামা নিয়ে যাব, আমেনা খালার দরজায় আমরা কড়া নাড়ব। হয়তো আমরা সবকিছু বদলাতে পারব না। কিন্তু আমরা যদি একজন মানুষের মুখে হাসি আনতে পারি—তাহলেই আমাদের ঈদ সফল। কারণ,
ঈদ তখনই সত্যিকারের ঈদ হয়— যখন কারো চোখের জল মুছে যায়, আর সেই চোখে ফুটে ওঠে একটুখানি হাসি।