
মোঃ রাকিব কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ঘুরেঃ
পরিবার নিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণ—যেখানে প্রত্যেকটি মুহূর্তে থাকবে আনন্দ, সমুদ্রের নীল জলরাশিতে ছুটে বেড়ানো, শিশুর হাসি আর স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু হঠাৎ একদিন, ঘরে ফিরে ইউটিউব স্ক্রল করার সময় চোখ কপালে ওঠার মতো এক দৃশ্য সামনে আসে—গোপনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রে গোসলরত আপনার পরিবারের নারীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিডিওটি লাখো মানুষ দেখেছে। সহকর্মী, প্রতিবেশী, বন্ধুরাও এটি দেখেছে। মুহূর্তের মধ্যে যে সম্মান, গোপনীয়তা আর নিরাপত্তা ছিল, সবই চূর্ণবিচূর্ণ। যেখানে পর্যটন মানেই শান্তি, আনন্দ ও আনন্দের মুহূর্ত—সেখানে আজ ‘ভিউ ব্যবসায়ীদের’ হাত ধরে পরিবারই হয়ে উঠছে ব্যবসার পণ্য। কক্সবাজারের মতোই চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের আরেক পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটাতেও। ভিউ ব্যবসার আড়ালে লুকানো কৌশল বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এমন ভিউ ব্যবসা গোপন নয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, Travel View, Explore Cox’s Bazar, ঘুরে বেড়ায়—এমন নামধারী ট্রাভেল ব্লগের আড়ালে ইউটিউব চ্যানেল তৈরি হচ্ছে, যেগুলো মূলত নগ্ন কৌতূহলকে পুঁজি করে আয় করছে। এসব চ্যানেল নিয়মিত তৈরি করছে গোপনে ধারণ করা অশ্লীল ভিডিও—বিশেষ করে গোসলরত নারী বা পরিবারের স্বাভাবিক মুহূর্তের দৃশ্য। ‘ঘুরে বেড়ায়’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভিডিও ধারণ ও আপলোডের বিষয়ে কথা এড়িয়ে যান। তবে অনলাইনেই ভিডিও রয়ে গেছে, ভিউ বাড়ছে, ক্ষতি হচ্ছে অসংখ্য পরিবারের। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আয়ের এই ভিউ ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি। ভিউ ব্যবসা কি শুধু বাংলাদেশি সমস্যা? দেখা যাচ্ছে, এটি শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়। ভারতের গোয়া, মায়ামি বিচ বা থাইল্যান্ডের ফুকেট—যেখানে পর্যটক আসে ছুটি ও বিনোদনের জন্য, সেখানে একই কৌশলে পর্যটকদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। অর্থাৎ এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। এটি আঞ্চলিক নয়—একটি আন্তর্জাতিক ভিউ-সন্ত্রাস, যেখানে পর্যটকদের বিনোদন কিংবা মানসিক শান্তিকে পুঁজি করে ব্যবসা করা হচ্ছে। প্রশাসনের অবস্থান কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং ডিআইজি আপেল মামুদের সঙ্গে যোগাযোগে জানা গেছে, “গোপনে ধারণ করা ভিডিও অপরাধের আওতাভুক্ত। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—অভিযোগের আগেই কেন পর্যটন এলাকায় কার্যকর নজরদারি নেই? কেন সৈকত এলাকায় টহল, সাইবার নজরদারি ও পর্যটক সচেতনতা জোরদার করা হচ্ছে না?” প্রশ্নটি সমালোচনামূলক: আমাদের সৈকতগুলো কি সত্যিই নিরাপদ? আমরা কি এখন প্রতিটি সৈকত ভ্রমণে ক্যামেরার ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারি? যেখানে সমুদ্রের শান্তি, শিশুর হাসি আর পরিবারের আনন্দ—সেখানে এখন লুকিয়ে থাকে অশ্লীলতার খতরা। মানসিক ও সামাজিক প্রভাব গোপন ভিডিও দ্বারা ভুক্তভোগী পরিবার শুধু সামাজিক বিব্রত নয়, মানসিকভাবে টালমাটাল হয়ে পড়ে। আত্মবিশ্বাস ক্ষুণ্ণ হয়, পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, আর সমাজে আঘাত আসে। শিশুরাও এই ক্ষতির অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে, এই ধরনের ভিডিও অনলাইনে প্রচার হয়ে গেলে দেশের পর্যটন চিত্রও নষ্ট হয়। বিদেশি পর্যটকেরা হয়তো সতর্ক হবে, স্থানীয় পর্যটকদেরও নিরাপত্তার মানসিক চাপ বেড়ে যাবে। যে দেশকে ‘পর্যটনের স্বর্গ’ বলা হয়—সেখানে এখন পরিবার বা শিশুর সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ভিউ ব্যবসার অর্থনৈতিক কৌশল গোপনে ভিডিও ধারণ ও অনলাইনে আপলোড করে কোটি কোটি ভিউ আসে। প্রতিটি ভিউ অর্থে রূপান্তরিত হয়—লাখ লাখ টাকা আয় হয়। অর্থাৎ, পর্যটকদের ব্যক্তিগত জীবন কৌশলগতভাবে ব্যবসায় রূপান্তরিত হচ্ছে। এটি একটি নতুন ধরনের সাইবার ক্রাইম, যেখানে বিনোদন ও পর্যটনের নাম ব্যবহার করে অপরাধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও প্রশাসনের পদক্ষেপ ১. নিয়মিত তল্লাশি ও পর্যবেক্ষণ: পর্যটন এলাকায় টহল জোরদার করতে হবে। ২. সাইবার নজরদারি: ইউটিউব ও অন্যান্য সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অশ্লীল কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও অপসারণ। ৩. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: গোপন ভিডিও ধারণ ও আপলোডকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কড়া আইন প্রয়োগ। ৪. পর্যটক সচেতনতা: প্রতিটি পর্যটককে সতর্ক করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার গুরুত্ব বোঝানো। ৫. আন্তর্জাতিক সমন্বয়: আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, যাতে একই কৌশল বা অপরাধ বন্ধ করা যায়। পর্যটন মানেই শান্তি, আনন্দ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়। কিন্তু যখন এই আনন্দের জায়গা হয়ে উঠে ভিউ ব্যবসায়ীদের শিকার, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? সৈকতের নীল জল, বালির কোমলতা আর সূর্যাস্তের সৌন্দর্য কি এখন ফাঁদে পরিণত হয়েছে? ভিউ ব্যবসা শুধু অর্থ নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক ক্রাইম। আমাদের পরিবার, আমাদের শিশু, আমাদের সতেজতার আনন্দ—সবই যেন আজ ‘ক্যামেরার ফাঁদে’ বন্দী। এই অপরাধকে কেবল আইনের আওতায় আনা নয়, সতর্কতা, সচেতনতা ও সামাজিক জাগরণও সমানভাবে জরুরি। না হলে পর্যটন স্বর্গ অচিরেই ভিউ ব্যবসায়ীদের শিকার হয়ে যাবে। আজ প্রশ্নটি একটাই—আমাদের সৈকত, আমাদের পরিবার, আমাদের আনন্দ কি এখন নিরাপদ? উত্তর খুঁজে পেতে হলে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, পর্যটকদের সচেতন হতে হবে, আর সামাজিকভাবে গোপনীয়তা রক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভিউ ব্যবসা রুখতে হবে—না হলে সমুদ্রের নীল জল আর বালির কোমলতা শুধু আমাদের স্বপ্নেই সীমিত থাকবে।


