
-মো.কামাল উদ্দিনঃ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা, গুরুতর অপরাধ দমন এবং সন্ত্রাস মোকাবেলায় দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ২০০১ সালের পর রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান অবনতি রোধের প্রয়াসে একটি কার্যকর বাহিনী গঠনের চিন্তা শুরু হয়। ২০০৩ সালে চূড়ান্তভাবে র্যাব গঠিত হয়, যা সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন (সংশোধনী) ২০০৩-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে এই বাহিনীর নাম নিয়ে নানা প্রস্তাবনা ছিল “র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স” বা “র্যাপিড অ্যাকশন টিম”। শেষ পর্যন্ত গঠিত বাহিনীর নাম হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, সংক্ষেপে র্যাব। র্যাবের মূল কাঠামোতে বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয় রয়েছে। আইন অনুযায়ী, র্যাবের দায়িত্ব হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অপরাধ এবং অপরাধ সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, বেআইনি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, সশস্ত্র অপরাধীদের গ্রেপ্তার, পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীকে সহায়তা প্রদান এবং সরকারের নির্দেশিত অন্যান্য কার্যাবলি। র্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে আদালতে প্রেরণ করেন। এই কাঠামোর মাধ্যমে র্যাবকে একটি স্বতন্ত্র, প্রভাবশালী ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সম্প্রতি র্যাবের নতুন মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ একটি মতবিনিময় সভায় র্যাবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, র্যাবের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়ভার র্যাবের নয়, বরং তা সরকারের বিবেচনার বিষয়। তাঁর বক্তব্য, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আমাদের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা এবং র্যাবকে জনগণের সামনে সুনামসহ উপস্থাপন করা। অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি থাকলে তা আমরা নিজস্বভাবে তদন্ত করি। এখানে কোনো ছাড় নেই।” মহাপরিচালক বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে উল্লেখ করেন যে, র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে কোথাও বিচ্যুতি বা পদস্খলন ঘটেছে। তিনি বলেন, “যদি আমরা সেই স্থানগুলো মেরামত করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।” এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ক্রসফায়ার মামলার প্রসঙ্গেও তিনি জানান, র্যাব সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করবে, যতটুকু তথ্য তাদের কাছে আছে, তা দিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে। র্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, “বিগত দেড় বছরে, বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের সময়, র্যাবের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অপকর্মের ইতিহাস খুব সীমিত। এটি প্রমাণ করে যে র্যাবকে সঠিকভাবে পরিচালনা করলে এটি সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে। বর্তমান সরকার র্যাবকে সঠিক কাজে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা সেই নির্দেশনা মেনে কাজ করছি।” মহাপরিচালক র্যাবের গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “র্যাব একটি পেশাদার, মানবিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংস্থা হিসেবে গড়ে উঠুক—এটাই আমাদের লক্ষ্য। ভবিষ্যতে র্যাব দেশের জন্য অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে।” জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে তিনি বলেন, “যা-ই থাকুক, আমরা সব ধরনের উগ্রবাদ ও অপরাধ নির্মূলের জন্য কাজ করছি। ইনশা আল্লাহ, আমরা সফল হব। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড এবং সুন্দরবনের জলদস্যুদের বিষয়েও র্যাব কার্যক্রম চালাচ্ছে।” মহাপরিচালক র্যাবের সাফল্যও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “র্যাব জামায়াতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশ ও হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে। ভোলা জেলার একটি কওমী মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাও র্যাবের সুনামের প্রমাণ।” এছাড়া তিনি স্বীকার করেন, র্যাবের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের পেছনে অনেক সময় পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময় বা এনকাউন্টার প্রক্রিয়াও ছিল। র্যাবের প্রতিষ্ঠাতা কাঠামো এবং আইনি অধিকার নিয়ে তিনি বলেন, “র্যাবের গঠন শৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় স্বতন্ত্রভাবে কার্যকর। শুধুমাত্র র্যাবের সদস্যরাই নির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং জননিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। আমাদের লক্ষ্য হলো এই সংস্থাকে আরও পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, যাতে ভবিষ্যতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।” মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ আরও বলেন, র্যাবকে মানবিক ও সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে পরিচালনা করা হবে। জনগণের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো, আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ত্রুটি সমাধানের মাধ্যমে র্যাবকে একটি আদর্শ শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই র্যাব শুধু একটি নিরাপত্তা বাহিনী নয়, জনগণের বিশ্বাসের একটি প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।” উপরন্তু, মহাপরিচালক জানান, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে র্যাবের অপকর্ম ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত এবং সংশোধন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিটি অভিযানের পর বিশ্লেষণ করি, যেখানে কিছু ত্রুটি বা বিচ্যুতি থাকলে তা ঠিক করি। এভাবে র্যাবকে আরও শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী করা সম্ভব।” মোটের ওপর, মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশের লক্ষ্য স্পষ্ট—র্যাবকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে একটি সুনামের, পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, র্যাব ভবিষ্যতে দেশের জননিরাপত্তা রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি উদাহরণ স্থাপন করবে।

