
চট্টগ্রাম, প্রতিনিধি— দেশের প্রধান বন্দরনগরী ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম আজ গভীর গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত। শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত এই শহরের গৃহস্থালি জীবন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কলকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অলিগলি থেকে শুরু করে কালুরঘাট, নাসিরাবাদ, পতেঙ্গা, বায়েজিদ, পাহাড়তলী—সবখানেই একই দৃশ্য: চুলা জ্বলে না, কারখানার মেশিন থেমে থাকে, আর সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—গ্রাহকরা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতেও প্রস্তুত, তবু মিলছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, সংকটটি আর সাময়িক নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও ভুল পরিকল্পনার ফল। চট্টগ্রামের বহু এলাকায় দিনের বেলা গ্যাস একেবারেই থাকে না। ফলে গৃহিণীরা গভীর রাতে বা ভোররাতে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও রান্না করতে পারছেন না। কোথাও কোথাও বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নগর জীবনে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। নগরীর মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য হোটেলের খাবার বা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া আর্থিকভাবে চরম চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি—এই দ্বিমুখী চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সংকট সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তৈরি পোশাক, স্টিল মিল, রি-রোলিং মিল, টেক্সটাইল, কেমিক্যাল ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্পগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা আংশিকভাবে বন্ধ, কোথাও কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি স্থগিত। শিল্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাস না থাকায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। এতে পণ্যের দাম বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশ। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও বাড়ছে, যা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে। গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের চিত্র। অনেক চালক সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে নগরীতে গণপরিবহন সংকট তৈরি হচ্ছে, যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সংকটের মূলে রয়েছে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ করেই অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—চট্টগ্রামের মতো দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি অঞ্চলের জন্য কেন বিকল্প উৎস ও শক্তিশালী ব্যাকআপ ব্যবস্থা রাখা হয়নি? কেন জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ ও সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ দীর্ঘদিনেও সম্পন্ন হয়নি? গ্যাস সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে অবৈধ সংযোগ। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে মূল লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে বৈধ গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। নগরবাসীর অভিযোগ—বাড়তি টাকা দিয়েও যখন সেবা পাওয়া যায় না, তখন স্পষ্ট হয় যে ব্যবস্থাপনায় গভীর ঘুণ ধরেছে। এই পরিস্থিতিতে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
এই অবস্থায় চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ও মহাসচিব মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এক যৌথ বিবৃতিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি তীব্র আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই শহর অচল হয়ে পড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। তাই গ্যাস সংকট নিরসনে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “লাইনের গ্যাস সংকটের পাশাপাশি সিলিন্ডার গ্যাসের কৃত্রিম সংকট নিরসনে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম গ্যাস অফিস ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।”
বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মতে, এই সংকট উত্তরণে এলএনজির ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, সংস্কার কাজে সময়সীমা নির্ধারণ এবং অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে কেন বাড়তি টাকা দিয়েও সেবা মিলছে না—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জনসমক্ষে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট আর কেবল একটি সেবাজনিত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা পর্যন্ত যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এখনই অগ্রাধিকারভিত্তিক, স্বচ্ছ ও টেকসই সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।


