
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম নগরীতে আর কোনো ছায়াবাহিনী, গডফাদার কিংবা সন্ত্রাসী শক্তির অস্তিত্ব মেনে নেওয়া হবে না। এই নগরীতে থাকবে একটিই বাহিনী—রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাংলাদেশ পুলিশ। সন্ত্রাসী যত বড়ই হোক, যে দলেরই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। নির্বাচন বানচালের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে—এই স্পষ্ট ও আপসহীন ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার ও অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের কর্ণফুলী হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথাগুলো বলেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল প্রশাসনিক দৃঢ়তা, তেমনি ছিল রাষ্ট্রদর্শন, গণতন্ত্র ও জবাবদিহির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। হাসিব আজিজ বলেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে তার বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বজায় থাকার মাধ্যমে। পুলিশ ও সাংবাদিকদের সম্পর্কেও সেই ভারসাম্য জরুরি। অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং পেশাগত দূরত্বই রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যম যখন একই সুরে কথা বলতে শুরু করে, তখনই গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং ফ্যাসিবাদের জন্ম নেয়। গত ১৭ বছরের শাসনব্যবস্থা তার বাস্তব ও ভয়াবহ উদাহরণ। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব প্রশ্ন করা, খতিয়ে দেখা এবং সত্য প্রকাশ করা। পুলিশকে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ প্রশ্নহীন ক্ষমতা কখনোই জনকল্যাণ বয়ে আনে না। নিজের ও পুলিশের কাজের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা প্রত্যাশা করে সিএমপি কমিশনার বলেন, তাঁর কিংবা তাঁর সহকর্মীদের কোনো ভুল, গাফিলতি বা অনিয়ম থাকলে সাংবাদিকরা যেন তা নির্ভয়ে তুলে ধরেন। সমালোচনাকে তিনি শত্রুতা নয়, বরং সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখেন। ভুল প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এই আশ্বাসও দেন তিনি। পুলিশ সদস্যদের আচরণ প্রসঙ্গে হাসিব আজিজ বলেন, পুলিশকে মনোভাবে কঠোর হতে হবে, কারণ তাদের মোকাবিলা করতে হয় অপরাধ ও সন্ত্রাসের। কিন্তু আচরণে হতে হবে বিনয়ী ও মানবিক। ‘পুলিশিং উইথ আ স্মাইলিং ফেস’—এই নীতির মধ্যেই আধুনিক পুলিশিংয়ের দর্শন নিহিত। ইউনিফর্মের ভেতরেও যে একজন সাধারণ নাগরিক আছেন—এই উপলব্ধি থেকেই জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূলে আপসহীন অবস্থান জানিয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন, “সাজ্জাদ বাহিনী, লাল্টু বাহিনী, পল্টু বাহিনী—এ ধরনের সব বাহিনী নির্মূল করতে হবে। নির্মূল মানে নির্মূল। প্রয়োজনে চরম পন্থা অবলম্বন করতেও আমি দ্বিধাবোধ করব না।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট—নগরীতে আর কোনো নামধারী বাহিনী, গোপন শক্তি কিংবা সন্ত্রাসের আশ্রয় থাকবে না। চট্টগ্রাম হবে আইনের শহর, নিরাপদ নাগরিক জীবনের শহর। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে হাসিব আজিজ বলেন, বিতাড়িত স্বৈরাচার ও তাদের দেশি-বিদেশি সহযোগীরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের কাছে নির্বাচন একটি ‘লিটমাস টেস্ট’। এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করাই পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘ন্যাশনাল অ্যাসেট’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানিত এমন মানুষ খুব কমই আছেন। তাঁকে ব্যর্থ হতে দেওয়া মানে রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। তাই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের স্বার্থেই তাঁকে সফল হতে দিতে হবে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে সিএমপি কমিশনার জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ অস্ত্র পাহাড়ি অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতে থাকার তথ্য রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগেই এসব অস্ত্র উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ-এর আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচির সভাপতিত্বে এবং চ্যানেল ওয়ানের ব্যুরো প্রধান শাহনেওয়াজ রিটনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক। বক্তব্য রাখেন ডেইলি পিপলস ভিউ সম্পাদক ও প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি মনসুর, সিনিয়র সহসভাপতি ও কালের কণ্ঠ ব্যুরো প্রধান মুস্তফা নঈম, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বাসস বিশেষ প্রতিনিধি মিয়া মো. আরিফ, কার্যকরী সদস্য সালেহ নোমান, ইনকিলাব ব্যুরো প্রধান রফিকুল ইসলাম সেলিমসহ আরও অনেকে। সভায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ প্রায় শতাধিক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; এটি চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষার একটি স্পষ্ট রূপরেখা। হাসিব আজিজের কণ্ঠে উচ্চারিত বার্তা একটাই—আইনের বাইরে কেউ নয়, আর চট্টগ্রামে শাসন করবে কেবল আইন।


