
মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ
ডেপুটি এডিটর, দি টুরিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের অসংখ্য দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়। পর্যটনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর।
কারণ প্রকৃতি যেন বাংলাদেশকে পর্যটনের জন্য বিশেষভাবে সাজিয়েছে। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, হাওর, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ধর্মীয় নিদর্শন, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের সহজাত আতিথেয়তা মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় পর্যটনভূমি।
আর বাংলাদেশের এই পর্যটন সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় দরজাগুলোর একটি হলো চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা কঠিন। কারণ চট্টগ্রাম শুধু একটি জেলা বা একটি নগরী নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি বিশাল পর্যটন প্রবেশদ্বার। সরকারি পর্যটন তথ্যেও চট্টগ্রাম বিভাগকে একাধিক বৈচিত্র্যময় পর্যটন গন্তব্যের সমন্বিত অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কেন বাংলাদেশের পর্যটনের কেন্দ্র হতে পারে?
একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদী, তার সঙ্গে পাহাড়, বন, দ্বীপ, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতি।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই তাকে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা একটি পর্যটন সম্ভাবনা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে ফয়েজ লেক, বাটালী হিল, জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, চট্টগ্রাম কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি, বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার, ঐতিহাসিক কোর্ট বিল্ডিং, লালদীঘি ও ভাটিয়ারী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে পর্যটনের নানা উপাদান। সরকারি জেলা পোর্টালেও এসব স্থান পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে একটু দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে তাকালেই খুলে যায় আরও বিশাল একটি পর্যটনভূমি।
একদিকে কক্সবাজারের সমুদ্র। অন্যদিকে বান্দরবানের পাহাড়। রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি প্রকৃতি। সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের পাহাড়, ঝরনা ও উপকূলীয় সৌন্দর্য। বাঁশখালীর সমুদ্র ও পাহাড়। সন্দ্বীপের দ্বীপজীবন। মহেশখালীর ঐতিহ্য। রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্য। টেকনাফের পাহাড়, বন ও সমুদ্র।
অর্থাৎ চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের একটি বিশাল সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন বলয় গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম শুধু যাত্রাপথ নয়, নিজেই একটি গন্তব্য
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় চট্টগ্রামকে কক্সবাজার বা পার্বত্য চট্টগ্রামে যাওয়ার পথ হিসেবে দেখা হয়। অথচ চট্টগ্রাম নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
পতেঙ্গার সমুদ্র, কর্ণফুলীর মোহনা, পাহাড়ের সবুজ, ভাটিয়ারীর লেক, ফয়েজ লেকের সৌন্দর্য, বাটালী হিলের দৃশ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং নৃ-সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী জাদুঘর—সব মিলিয়ে একটি পর্যটকের জন্য চট্টগ্রামে কয়েক দিনের পর্যটন পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের পর্যটন তথ্যেও চট্টগ্রামের সঙ্গে সমুদ্রসৈকত, ঐতিহ্য, পাহাড়, দ্বীপ ও জলভিত্তিক বিভিন্ন গন্তব্যকে একই বৃহত্তর পর্যটন অঞ্চলের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, এই বিপুল সম্ভাবনাকে আমরা কতটা কাজে লাগাতে পেরেছি?
চট্টগ্রামের পর্যটন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে
চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়ন বলতে শুধু পতেঙ্গায় কিছু সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণকে বোঝালে চলবে না।
প্রয়োজন একটি সমন্বিত চট্টগ্রাম পর্যটন মহাপরিকল্পনা।
এই পরিকল্পনায় নগর পর্যটন, সমুদ্র পর্যটন, পাহাড়ি পর্যটন, নদী পর্যটন, দ্বীপ পর্যটন, ঐতিহাসিক পর্যটন, ধর্মীয় পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীকে হতে হবে সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।
পতেঙ্গা থেকে কর্ণফুলী: সমুদ্র ও নদী পর্যটনের সম্ভাবনা
পতেঙ্গা শুধু একটি সমুদ্রসৈকত নয়। কর্ণফুলী নদী যেখানে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই ভূপ্রকৃতিই এখানে একটি বিশেষ পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
কিন্তু পতেঙ্গাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে হলে শুধু দোকান ও মানুষের ভিড় বাড়ালেই হবে না।
প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন সৈকত, পরিকল্পিত হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত বসার স্থান, আধুনিক গণশৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আলোকসজ্জা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং নদী ও সমুদ্রভিত্তিক নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা।
কর্ণফুলী নদীকেও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
নিরাপদ নদীভ্রমণ, ঐতিহ্যবাহী নৌযান, নদীর তীরভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং কর্ণফুলীকে কেন্দ্র করে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি করা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই: প্রকৃতির আরেক স্বর্গ
চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলও পর্যটনের জন্য অসাধারণ সম্ভাবনাময়।
সীতাকুণ্ডের পাহাড়, ঝরনা, বন ও পরিবেশগত বৈচিত্র্য এবং মিরসরাইয়ের বিস্তৃত পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের আওতায় আনা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন মানচিত্র আরও বড় হবে।
এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পরিবেশ রক্ষা।
পাহাড় কেটে পর্যটন তৈরি করা যাবে না। ঝরনার পানি দূষিত করে পর্যটন করা যাবে না। প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিনে পাহাড়-ঝরনা ভরে ফেলে পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন নয়, প্রকৃতি রক্ষা করেই পর্যটন।
এই নীতিই হতে হবে চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নের মূল দর্শন।
সন্দ্বীপ: দ্বীপ পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দ্বীপভিত্তিক পর্যটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা।
দ্বীপের মানুষের জীবন, সমুদ্র, নদী, চর, সূর্যাস্ত, নৌযাত্রা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি—সবকিছু মিলে সন্দ্বীপকে একটি আলাদা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বিকশিত করা যেতে পারে।
পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযান, আবাসন, স্থানীয় খাদ্য, গাইড ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন সুবিধা তৈরি করা গেলে সন্দ্বীপে নতুন ধরনের পর্যটনের দ্বার খুলতে পারে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম: একসঙ্গে সমুদ্র ও পাহাড়
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।
বাংলাদেশের অনেক পর্যটন এলাকায় হয় পাহাড়, নয়তো সমুদ্র। কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একজন পর্যটক একই ভ্রমণ পরিকল্পনায় সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করতে পারেন।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের সমুদ্র, বান্দরবানের পাহাড়, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, খাগড়াছড়ির পাহাড়ি প্রকৃতি—সবকিছুকে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তালিকাতেও চট্টগ্রাম বিভাগের পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন গন্তব্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এটিই হতে পারে বাংলাদেশের একটি অনন্য পর্যটন ব্র্যান্ড।
“চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্র, পাহাড় ও সংস্কৃতির বাংলাদেশ”।
কক্সবাজারকে চট্টগ্রামের পর্যটন করিডোরের অংশ হিসেবে দেখতে হবে
কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে সমুদ্র, দ্বীপ, পাহাড়, বন ও ঐতিহাসিক স্থাপনার সমন্বিত পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজারকে শুধু আলাদা একটি পর্যটন শহর হিসেবে দেখলে সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও অন্যান্য উপকূলীয় গন্তব্যকে একটি পর্যটন করিডোরের মধ্যে আনা দরকার।
এতে পর্যটক একটি জায়গায় এসে অন্য জায়গায় চলে যাবেন না; বরং কয়েক দিন ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করার সুযোগ পাবেন।
এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন মানেই কর্মসংস্থান
চট্টগ্রামের লাখ লাখ তরুণকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট কর্মী, পর্যটন পরিবহন, নৌযান পরিচালনা, ফটোগ্রাফি, ভিডিও নির্মাণ, অনলাইন পর্যটন প্রচার, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে তরুণরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
পর্যটন উন্নয়ন তাই শুধু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ নয়, এটি মানুষের জীবনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও একটি সম্ভাবনা।
চট্টগ্রামের স্থানীয় খাবারও পর্যটনের সম্পদ
পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাবার।
চট্টগ্রামের মেজবান, কালাভুনা, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি, নানা ধরনের আঞ্চলিক রান্না এবং উপকূলীয় খাবারকে পর্যটনের ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করা যেতে পারে।
একজন পর্যটক যখন কোনো জায়গায় যান, তখন তিনি শুধু দৃশ্য দেখতে চান না, সেই এলাকার স্বাদও নিতে চান।
তাই “চট্টগ্রামের খাবার” হতে পারে পর্যটনের একটি আলাদা পরিচয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে
চট্টগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
বন্দরনগরীর ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মারক, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়—সবকিছু পর্যটনের অংশ হতে পারে।
বিশেষ করে ইতিহাসভিত্তিক হাঁটা ভ্রমণ বা হেরিটেজ ওয়াক চালু করা যেতে পারে।
পুরোনো চট্টগ্রামকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য একটি পরিকল্পিত ঐতিহ্য পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পর্যটন ও পরিবেশ: চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা
চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও বন রক্ষা না করে পর্যটন উন্নয়ন করলে ভবিষ্যতে পর্যটনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে।
পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
নদী ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে।
সমুদ্রসৈকতকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে হবে।
ঝরনা ও পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে ধারণক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
যেখানে পরিবেশগতভাবে অতিরিক্ত পর্যটক প্রবেশ ক্ষতিকর, সেখানে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
কারণ পর্যটনকেন্দ্র যত জনপ্রিয় হবে, তার ওপর চাপও তত বাড়বে।
পর্যটকের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যটন বাড়াতে হলে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।
পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সুবিধা, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন।
পাহাড়ি ঝরনায় দুর্ঘটনা, সমুদ্রসৈকতে সাঁতারের ঝুঁকি, নৌযাত্রার নিরাপত্তা এবং পাহাড়ি পথে চলাচলের বিষয়েও কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড থাকা দরকার।
একজন পর্যটক নিরাপদ বোধ করলেই তিনি আবার ফিরে আসবেন এবং অন্যদেরও আসতে উৎসাহিত করবেন।
চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে
চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র।
এই সুবিধাকে পর্যটনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা দরকার।
বিদেশি পর্যটক চট্টগ্রামে এসে যাতে সহজে কক্সবাজার, পার্বত্য অঞ্চল, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই কিংবা দ্বীপাঞ্চলে যেতে পারেন, সে জন্য সমন্বিত পর্যটন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একটি শহরকে শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে তার সম্ভাবনার একটি অংশই দেখা হয়।
চট্টগ্রাম একই সঙ্গে হতে পারে বাণিজ্যের নগরী, সমুদ্রের নগরী এবং পর্যটনের প্রবেশদ্বার।
চট্টগ্রামভিত্তিক পর্যটন সার্কিটের প্রস্তাব
আমার দৃষ্টিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য কয়েকটি পর্যটন সার্কিট তৈরি করা যেতে পারে।
প্রথম সার্কিট: চট্টগ্রাম নগরী, পতেঙ্গা, কর্ণফুলী, ফয়েজ লেক, বাটালী হিল, ঐতিহাসিক স্থাপনা।
দ্বিতীয় সার্কিট: চট্টগ্রাম, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, পাহাড় ও ঝরনা।
তৃতীয় সার্কিট: চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ইনানী, হিমছড়ি, রামু, মহেশখালী।
চতুর্থ সার্কিট: চট্টগ্রাম, বান্দরবান, পাহাড় ও ঝরনা।
পঞ্চম সার্কিট: চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কাপ্তাই হ্রদ ও পাহাড়ি সংস্কৃতি।
ষষ্ঠ সার্কিট: চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, আলুটিলা ও পাহাড়ি পর্যটন।
সপ্তম সার্কিট: চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ ও উপকূলীয় দ্বীপ পর্যটন।
এগুলো শুধু ভ্রমণপথ নয়। প্রতিটি সার্কিটের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণকে যুক্ত করা যেতে পারে।
প্রয়োজন চট্টগ্রাম পর্যটন কর্তৃপক্ষ বা শক্তিশালী সমন্বয় ব্যবস্থা
চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা এত বিস্তৃত যে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করে এর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পর্যটন উন্নয়নে একটি শক্তিশালী সমন্বয় ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সরকারি পর্যটন সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, বেসরকারি পর্যটন উদ্যোক্তা, পরিবেশবিদ, গণমাধ্যম, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পর্যটন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে
চট্টগ্রামের পর্যটন নিয়ে আরও অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রয়োজন।
শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যের ছবি প্রকাশ করলেই হবে না।
কোথায় সমস্যা, কোথায় সম্ভাবনা, কোথায় অবকাঠামোর ঘাটতি, কোথায় পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, কোথায় নতুন পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে—এসবও তুলে ধরতে হবে।
পর্যটন সাংবাদিকতা হতে পারে পর্যটন উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে চট্টগ্রামের দাবি
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে আমাদের একটি সুস্পষ্ট দাবি থাকা উচিত।
চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে নয়, বাংলাদেশের পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীকে পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
পতেঙ্গা ও কর্ণফুলীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের নদী ও সমুদ্র পর্যটন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের পাহাড় ও ঝরনা রক্ষা করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে হবে।
সন্দ্বীপকে দ্বীপ পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে উন্নত করতে হবে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িকে যুক্ত করে সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়নের নামে চট্টগ্রামের প্রকৃতি যেন ধ্বংস না হয়।
শেষ কথা
বিশ্ব পর্যটন দিবস আমাদের শুধু ভ্রমণের কথা বলে না। এটি আমাদের নিজেদের দেশকে নতুন চোখে দেখার আহ্বান জানায়।
আর যখন বাংলাদেশের পর্যটনের কথা বলি, তখন চট্টগ্রামকে সামনে রেখেই কথা বলতে হয়।
কারণ চট্টগ্রামের আছে সমুদ্র।
চট্টগ্রামের আছে পাহাড়।
চট্টগ্রামের আছে নদী।
চট্টগ্রামের আছে দ্বীপ।
চট্টগ্রামের আছে বন।
চট্টগ্রামের আছে ইতিহাস।
চট্টগ্রামের আছে সংস্কৃতি।
চট্টগ্রামের আছে বন্দর।
চট্টগ্রামের আছে মানুষের আতিথেয়তা।
আর সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে কক্সবাজারের সমুদ্র, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় এবং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের বিস্তৃত প্রকৃতি ও সংস্কৃতি।
এই সমন্বিত বৈচিত্র্য বাংলাদেশের আর কোনো অঞ্চলের পর্যটন পরিকল্পনায় এত ঘনভাবে পাওয়া কঠিন।
তাই সময় এসেছে চট্টগ্রামকে নতুন করে দেখার।
চট্টগ্রাম শুধু বাণিজ্যের রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের মহাদ্বার।
পতেঙ্গার সমুদ্র থেকে বান্দরবানের পাহাড়, কর্ণফুলীর বুক থেকে কাপ্তাই হ্রদ, সীতাকুণ্ডের ঝরনা থেকে কক্সবাজারের বালুকাবেলা, সন্দ্বীপের দ্বীপজীবন থেকে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সংস্কৃতি—সবকিছুকে একটি সুতোয় গেঁথে যদি আমরা একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় তৈরি করতে পারি, তাহলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রেও আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—
চট্টগ্রামের প্রকৃতি রক্ষা করব।
চট্টগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণ করব।
চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকে বিশ্বে তুলে ধরব।
স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করব।
আর চট্টগ্রামকে গড়ে তুলব বাংলাদেশের পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে।
কারণ,
চট্টগ্রামকে বুঝতে হলে শুধু একটি শহরকে দেখতে হবে না;
দেখতে হবে সমুদ্র, পাহাড়, নদী, দ্বীপ, ইতিহাস ও মানুষের এক অপূর্ব মিলনভূমিকে।
আর সেই মিলনভূমিই হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।


